২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, প্রস্তাবিত বাজেটের বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে এবং পরিচালন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার ও পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল অটোমেশনের মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ এবং করদাতাদের হয়রানি কমিয়ে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি
প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। এই সীমা ২০২৭-২৮ অর্থবছর পর্যন্ত বহাল থাকবে। এছাড়া ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
নারী করদাতা ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা আগামী দুই অর্থবছরে ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী করদাতাদের জন্য এ সীমা ৫ লাখ টাকা এবং গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই আন্দোলনের গেজেটভুক্ত অংশগ্রহণকারীদের জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা রাখা হয়েছে।
নিত্যপণ্যে কর ছাড়
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও বীজসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ ও ধনিয়াসহ বিভিন্ন মসলায় ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। খেজুর আমদানির ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও ওষুধ শিল্পে সুবিধা
কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ উৎপাদন এবং ওষুধ শিল্পের বিকাশে ৭৭টি নতুন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে প্রণোদনা
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার ও প্রযুক্তিনির্ভর অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
একই সঙ্গে স্টার্টআপ, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে তরুণদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কর্পোরেট কর অপরিবর্তিত
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আগামী অর্থবছরে কর্পোরেট করের হার অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে করের আওতা বাড়িয়ে করহার ধীরে ধীরে কমানোর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
এছাড়া উৎসে কর্তিত করকে আর বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য না করে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব করা হয়েছে। অতিরিক্ত পরিশোধিত কর ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হবে।
সারা বছর আয়কর রিটার্ন জমার সুযোগ
আয়কর ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনে সারা বছর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই রিটার্ন জমা দিলে করদাতারা বিশেষ কর ছাড় পাবেন। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের পরে জমা দিলে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
মোবাইল সিম কর প্রত্যাহার
প্রতিটি মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের হিসাবে এ সিদ্ধান্তের ফলে আগামী অর্থবছরে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব কম আসবে।
ইলেকট্রিক যানবাহনে শুল্ক-কর ছাড়
বৈদ্যুতিক যানবাহন শিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক, গাড়ি ও ই-বাইক খাতে বিভিন্ন শুল্ক-কর ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে বিদ্যমান কর অব্যাহতি ২০৩০ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, সরকারের লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা। এ লক্ষ্য অর্জনে করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করের পরিধি সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
