যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের বিচারবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য জেমি রাসকিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সম্পর্কের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছেন। এ লক্ষ্যে তিনি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর কাছে বিভিন্ন নথি চেয়ে পাঠানোর পাশাপাশি তাকে কংগ্রেসে লিখিত রেকর্ডের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
রোববার ইনফান্তিনোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে রাসকিন ট্রাম্প, তার প্রশাসন এবং তাদের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে ফিফার সব ধরনের যোগাযোগ, উপহার, অর্থ প্রদান কিংবা সুবিধা-সংক্রান্ত নথি জমা দেওয়ার অনুরোধ জানান। পাশাপাশি গত বছর নিউইয়র্কের ট্রাম্প টাওয়ারে স্থাপিত ফিফার কার্যালয়ে কারা যাতায়াত করেছেন, সেই ভিজিটর রেকর্ডও চাওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের ফিফা বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে নতুন প্রবর্তিত ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ দেওয়া হয়। ওই অনুষ্ঠানের জন্য প্রশাসনের নির্দেশে কেনেডি সেন্টারের সংস্কারকাজ তড়িঘড়ি করে শেষ করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ ওঠে। এর আগে গত জুলাইয়ে ট্রাম্প টাওয়ারে ফিফা তাদের নতুন কার্যালয় চালু করে।
বিশ্বকাপ চলাকালে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডজনিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে ট্রাম্প একাধিকবার ইনফান্তিনোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে ফিফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলে ঘটনাটি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয় এবং বিভিন্ন দেশের ফুটবল সংস্থা অসন্তোষ প্রকাশ করে।
স্পেনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার পরাজয়ে শেষ হওয়া বিশ্বকাপের ফাইনালের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে কানাডা ও মেক্সিকোর নেতাদের পাশাপাশি ট্রাম্পও উপস্থিত ছিলেন। ইনফান্তিনোর সঙ্গে ভিআইপি বক্সে খেলা দেখার পর মাঠে নামলে দর্শকদের একাংশ তাদের দুজনকে দুয়ো দেয়।
রাসকিন তার চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের সেই সিদ্ধান্তেরও উল্লেখ করেন, যেখানে বৈশ্বিক ফুটবলে দুর্নীতির তদন্তে অভিযুক্ত কয়েকজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়। এর মধ্যে ২০১৫ সালে ফিফার সাবেক ২০ জনের বেশি শীর্ষ কর্মকর্তা ও ক্রীড়া বিপণন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা বহুল আলোচিত দুর্নীতির মামলাও রয়েছে।
চিঠিতে রাসকিন দাবি করেন, ফিফার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ইনফান্তিনো সংস্থার নৈতিক জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল করেছেন এবং নীতিশাস্ত্র কমিটির অধিকাংশ সদস্যকে সরিয়ে দিয়েছেন। তার অভিযোগ, এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যাকে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আইন অধ্যাপক ও ফিফার সাবেক নীতিশাস্ত্র কমিটির সদস্য ‘বৈধ ঘুষ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রির নীতিও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন রাসকিন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল এ বিষয়ে তদন্ত করছেন। ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ ব্যবস্থার কারণে টিকিটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেক সমর্থক খেলা দেখতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাসকিনের দাবি, ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে ফিফা টিকিট বিক্রিতে অতিরিক্ত মূল্য আদায় এবং প্রতারণামূলক বিক্রয় কৌশল অনুসরণ করেছে, যার ক্ষতি বহন করতে হয়েছে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের।
চিঠিতে আগামী ৯ আগস্টের মধ্যে চাওয়া নথি জমা দেওয়া এবং সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় রিপাবলিকানদের সমর্থন ছাড়া ইনফান্তিনোকে বাধ্যতামূলকভাবে হাজির করানোর ক্ষমতা রাসকিনের নেই।
বিশ্বকাপ শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে ফিফার যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০৩১ সালের নারী বিশ্বকাপের প্রধান আয়োজক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। পাশাপাশি এবারের বিশ্বকাপ সফল হওয়ায় ২০৩৮ সালের পুরুষ বিশ্বকাপও দেশটিতে আয়োজনের আলোচনা চলছে।
এদিকে সোমবার ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় সমালোচকদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ আনেন ইনফান্তিনো। তিনি এবারের বিশ্বকাপকে সফল আয়োজন হিসেবে তুলে ধরেন।
আগামী মার্চে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা সভাপতির নির্বাচনের আগে ২০০টির বেশি সদস্যদেশের সমর্থন পেয়েছেন ইনফান্তিনো। তবে কয়েকটি ফুটবল সংস্থা তার বিরোধিতা করছে। এর মধ্যে নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ট্রাম্পের কথিত ভূমিকা নিয়ে ফিফার নীতিশাস্ত্র বিভাগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
