গাজা শহরের একটি প্রধান আবাসিক এলাকায় ইসরায়েলি ট্যাঙ্ক প্রবেশ

গাজা সিটি: স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ইসরায়েলের স্থল অভিযানের দ্বিতীয় দিনে গাজা শহরের একটি প্রধান আবাসিক এলাকায় ইসরায়েলি ট্যাঙ্ক ও সামরিক যানের একটি বহর প্রবেশ করেছে। এই অভিযানের লক্ষ্য হলো ওই এলাকার দখল নেওয়া।

ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, গাজা সিটির উত্তরাঞ্চলের শেখ রাদওয়ান এলাকার প্রবেশমুখে ট্যাঙ্ক, বুলডোজার এবং সাঁজোয়া গাড়ি চলাচল করছে। ইসরায়েলি বাহিনী তাদের অগ্রযাত্রা গোপন রাখতে গোলা এবং ধোঁয়ার শেল নিক্ষেপ করায় ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছে।যুদ্ধ শুরুর আগে শেখ রাদওয়ান এলাকায় হাজার হাজার মানুষ বসবাস করত। এটি গাজা শহরের অন্যতম জনবহুল এলাকা হিসেবে পরিচিত।

ইসরায়েল বলছে, গাজা সিটিতে তাদের অভিযানের উদ্দেশ্য হামাসের হাতে জিম্মিদের মুক্ত করা এবং প্রায় ৩,০০০ যোদ্ধাকে পরাজিত করা। তারা এই এলাকাটিকে হামাসের “শেষ ঘাঁটি” হিসেবে বর্ণনা করছে। তবে এই অভিযানের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক নিন্দা হচ্ছে।সেভ দ্য চিলড্রেন এবং অক্সফামের মতো ২০টিরও বেশি প্রধান সাহায্য সংস্থার নেতারা সতর্ক করে বলেছেন যে, “গাজায় চলমান অমানবিক পরিস্থিতি বিবেকবর্জিত”।

শেখ রাদওয়ানের বাসিন্দারা জানান, বুধবারের এই স্থল অভিযানের আগে ওই এলাকার ভবন এবং প্রধান রাস্তাগুলোতে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এটি স্থল হামলার প্রস্তুতির অংশ ছিল।সাদ হামাদা নামের একজন স্থানীয় বাসিন্দা যিনি বুধবার তার পরিবারের সাথে দক্ষিণ দিকে পালিয়ে গেছেন, বিবিসিকে বলেন, “ড্রোনগুলো কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি। তারা সোলার প্যানেল, পাওয়ার জেনারেটর, পানির ট্যাঙ্ক, এমনকি ইন্টারনেট নেটওয়ার্কও ধ্বংস করে দিয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে, আর এই কারণেই বেশিরভাগ মানুষ বিপদের ভয় থাকা সত্ত্বেও চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।”শেখ রাদওয়ান এলাকার মধ্যে আবু ইস্কান্দার, আল-তাওয়াম এবং আল-সাফতাভি এলাকাগুলো অন্তর্ভুক্ত। এই এলাকার মধ্য দিয়ে আল-জালা স্ট্রিট গেছে, যা মধ্য গাজা সিটির সাথে এর উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোকে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা।

স্থানীয়দের মতে, এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে এলে তারা শহরের আরও গভীরে এবং এর কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোতে প্রবেশ করতে পারবে।গাজা সিটির রাস্তায় ট্যাঙ্ক দেখে পশ্চিম ও মধ্য গাজা সিটিতে বসবাসকারী বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ট্যাঙ্কের উপস্থিতি তাদের পূর্ববর্তী অভিযানের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, যেখানে পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।

শেখ রাদওয়ানে এই অভিযান আরও একটি নতুন ধরনের বাস্তুচ্যুতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে হাজার হাজার পরিবার দক্ষিণ দিকে পালাচ্ছে। সালাহউদ্দিন রোড হয়ে দক্ষিণে যাওয়ার জন্য ইসরায়েলি সেনাবাহিনী একটি রাস্তা খুলে দিলে সেখানে গাড়ি ও মালবোঝাই ঠেলাগাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। বাসিন্দারা জানান, যানবাহনের অভাব এবং আকাশছোঁয়া দামের কারণে এই যাত্রা কয়েক ঘণ্টা লাগছে এবং শত শত শেকেল খরচ হচ্ছে।

যুদ্ধের আগে শেখ রাদওয়ান গাজা সিটির ব্যস্ততম এলাকাগুলোর মধ্যে একটি ছিল, যেখানে অসংখ্য স্কুল, মসজিদ এবং বাজার ছিল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এখানে বারবার বিমান হামলা হয়েছে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। তবে এখন ট্যাঙ্কের উপস্থিতি ইসরায়েলের স্থল অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন পর্যায় নির্দেশ করে।ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বুধবার সকালে জানিয়েছে, স্থল সেনাদের সহায়তায় তারা গত দুই দিনে গাজা সিটির ১৫০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আইডিএফ তাদের অভিযানে রিমোট-কন্ট্রোলড বিস্ফোরক বোঝাই পুরোনো সামরিক যানও ব্যবহার করছে। এগুলোকে হামাসের অবস্থানে নিয়ে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছে।

নিদাল আল-শেরবি নামের একজন বাসিন্দা বিবিসি আরবির মিডল ইস্ট ডেইলি অনুষ্ঠানে বলেন, “গত রাতটা ছিল অত্যন্ত কঠিন, অবিরাম বিস্ফোরণ ও গোলাবর্ষণ রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চলেছে।”তিনি আরও বলেন, “ইসরায়েলি যানগুলো শেখ রাদওয়ান, তাল আল-হাওয়া এবং শেজাইয়া থেকেও অগ্রসর হচ্ছিল। এটি ছিল খুবই, খুবই ভয়ংকর একটি রাত।”

সাহায্য সংস্থা, জাতিসংঘের সংস্থা এবং অন্যান্যরা জানিয়েছে, যে “মানবিক এলাকায়” মানুষদের সরে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে তা অত্যধিক জনবহুল এবং প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে সেখানে জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়।যারা সামরিক নির্দেশ মেনে ওই অঞ্চলে চলে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ সেখানে তাঁবু খাটানোর মতো জায়গা না পেয়ে উত্তর দিকে ফিরে এসেছে।

উত্তর গাজায় অবস্থান করা মুনির আজ্জাম বিবিসিকে বলেন, “প্রতিদিন আমাদের কাছে লিফলেট ফেলা হচ্ছে, যাতে বলা হচ্ছে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে। অথচ ইসরায়েলি সেনাবাহিনী চারদিক থেকে ভবনগুলোতে গোলাবর্ষণ করছে।” তিনি বলেন, “কিন্তু আমরা কোথায় যাব? দক্ষিণে আমাদের কোনো আশ্রয় নেই।”আইডিএফ মঙ্গলবার জানিয়েছে, প্রায় ৩৫০,০০০ মানুষ গাজা সিটি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তবে জাতিসংঘ এই সংখ্যা আগস্ট থেকে ১৯০,০০০ বলে উল্লেখ করেছে। অনুমান করা হয়, এখনো অন্তত ৬৫০,০০০ মানুষ সেখানে রয়ে গেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামলার জবাবে ইসরায়েল গাজায় এই যুদ্ধ শুরু করে, যেখানে প্রায় ১,২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়েছিল।

গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, এরপর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৬৫,০৬২ জন নিহত হয়েছে, যাদের প্রায় অর্ধেকই নারী ও শিশু।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বুধবার জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় ৯৮ জন নিহত এবং ৩৮৫ জন আহত হয়েছে। এছাড়া, আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে অপুষ্টিতে। এর ফলে, আগস্টের শেষের দিকে জাতিসংঘ সমর্থিত একটি সংস্থা যখন গাজা সিটিতে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করে, তখন থেকে অপুষ্টি-জনিত মৃত্যুর সংখ্যা ১৫৪-তে দাঁড়িয়েছে।

জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, এই অভিযানের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে বেসামরিক নাগরিকরা “আরও গভীর বিপর্যয়ের” মুখে পড়বে।মঙ্গলবার, জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন জানায়, ইসরায়েল গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ঘটিয়েছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদনকে “বিকৃত ও মিথ্যা” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।