সৌদি–পাকিস্তান সামরিক চুক্তিতে ভারত কি কোণঠাসা হবে?

সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সামরিক চুক্তিকে অনেক বিশ্লেষক দেখছেন সম্ভাব্য “ইসলামী ন্যাটোর ভিত্তিপ্রস্তর” হিসেবে। তাঁদের মতে, এই সমঝোতা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘বিপদ সংকেত’, এবং এটি নয়াদিল্লির পররাষ্ট্রনীতির বড় ব্যর্থতা হিসেবেও চিহ্নিত হচ্ছে।

🔹 মোদির পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে মনোযোগী ছিলেন। সৌদি আরব, ইউএই, কাতার ও বাহরাইন সফর করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেন তিনি।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও রিয়াদ ও ইসলামাবাদকে এই সামরিক চুক্তি থেকে বিরত রাখা যায়নি।

কেউ কেউ একে ভারতের গোয়েন্দা ব্যর্থতা বলেও আখ্যা দিয়েছেন, কারণ নয়াদিল্লি এ বিষয়ে আগেভাগে কিছুই জানতে পারেনি।

🔹 ভারতের জন্য সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি

সাবেক সেনা কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই চুক্তির ফলে ভবিষ্যতে পাকিস্তানের মাটিতে ভারতের সামরিক অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।

চুক্তি অনুযায়ী, কোনো দেশ আক্রান্ত হলে অপর দেশ তার পাশে দাঁড়াবে — অর্থাৎ, পাকিস্তানের পাশে সৌদি বাহিনীও থাকতে পারে।

এতে ভারতকে একসঙ্গে দুটি দেশের সামরিক শক্তির মোকাবিলা করতে হতে পারে।

🔹 সীমান্ত উত্তেজনা ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা

ভারত–পাকিস্তান সম্পর্ক আগেই উত্তেজনাপূর্ণ। সিন্ধু চুক্তি স্থগিত, কাশ্মীর ইস্যু, ও স্যার ক্রিক বিতর্কে দুই দেশের সম্পর্ক নাজুক অবস্থায় আছে।

এদিকে, পাকিস্তান তার সামরিক বাজেট বাড়িয়ে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে হাজার কোটি ডলার বরাদ্দ দিয়েছে।

গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্সে পাকিস্তান ১২তম, সৌদি ২৪তম, আর ভারত রয়েছে ৪র্থ স্থানে — তবে দুই দেশের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা বাজেট এখন ভারতের সমপর্যায়ের, যা নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

🔹 সৌদি সামরিক শক্তি ও কৌশলগত জ্বালানি প্রভাব

সৌদি বিমানবাহিনীর হাতে রয়েছে F-15 ফাইটার জেট এবং Eurofighter Typhoon। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই অস্ত্র পাকিস্তানকে সরবরাহ করতে পারে রিয়াদ।

এছাড়া সৌদি আরব ভারতের প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী— ভারতের ৮৫% তেল আমদানি নির্ভর করে বিদেশে, যার বড় অংশ আসে সৌদি থেকে।

ফলে রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

🔹 মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও “ইসলামী ন্যাটো”র সম্ভাবনা

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ইসলামাবাদ এখন অন্যান্য মুসলিম দেশকেও একই রকম সামরিক জোটে যুক্ত করতে চাইছে।

যদি ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্র একত্র হয়, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হতে পারে।

তবে অন্য বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান মূলত এই “পরমাণু সুরক্ষা” যুক্তি দেখিয়ে সৌদিসহ অন্যান্য দেশ থেকে অর্থ তুলতে চাইছে, যার বড় অংশ ব্যয় হবে সেনাশক্তি বাড়াতে।

🔹 প্রবাসী ভারতীয়দের ঝুঁকি

সৌদি ও উপসাগরীয় অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ৯০ লাখ ভারতীয় শ্রমিক কাজ করছেন।

চুক্তি–পরবর্তী উত্তেজনা দেখা দিলে ইসলামাবাদ রিয়াদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

হঠাৎ করে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক দেশে ফিরে এলে ভারতের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স সংকট তৈরি হতে পারে।

🔹 ভারতের বিকল্প কূটনৈতিক বিকল্প

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল বা রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটো ধাঁচের সামরিক জোট করা কঠিন।

ইসরাইলের সঙ্গে গেলে আরব বিশ্বের বিরোধিতা; যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গেলে সেনা মোতায়েনের শর্ত; আর রাশিয়ার সঙ্গে গেলে ইউক্রেন সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি — সব মিলিয়ে মোদি সরকার এখন ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করছে।

🔹 অর্থনৈতিক বাস্তবতা: সৌদি–ভারত বাণিজ্য বনাম পাকিস্তান

বর্তমানে সৌদি ভারতের চতুর্থ বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার, যেখানে বছরে প্রায় ৪,১৮৮ কোটি ডলারের লেনদেন হয়।

অন্যদিকে, পাকিস্তান–সৌদি বাণিজ্য মাত্র ৩০০–৪০০ কোটি ডলারে সীমাবদ্ধ।

ফলে সৌদি আরবের পক্ষে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক, মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

🔹 উপসংহার

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি–পাকিস্তান চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে নতুন ভারসাম্য তৈরি করেছে।

তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে সৌদি সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে না, এমন আশাবাদও রাখছেন অনেকে।

তবুও নয়াদিল্লির জন্য এটি একটি কূটনৈতিক সতর্কবার্তা, যা ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।