ঢাকা: দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় নিয়ে সরকার গঠনের পথে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল আর্থিক ভিত্তির ওপর দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। দীর্ঘ অস্থিরতা, অনিয়ম ও আর্থিক দুর্বলতায় বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে অন্তর্বর্তী সরকার ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে ফেরাতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি
বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সাফল্য। ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি “খাদের কিনারে” ছিল বলে মন্তব্য করেছেন পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ। দ্রুত পদক্ষেপে নিম্নমুখী প্রবণতা থামিয়ে পুনরুদ্ধারের ধারা তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা ও অনিয়ম প্রতিরোধে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ কমেছে, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন শুরু হয়েছে এবং আর্থিক খাতে আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
রিজার্ভ, রেমিট্যান্স ও মূল্যস্ফীতিতে উন্নতি
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ২৯.৪৭ বিলিয়ন ডলার। আগের সরকারের শেষ সময়ে যা ছিল প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, হুন্ডি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলার ফলে এ উন্নতি হয়েছে।
মূল্যস্ফীতিও কমার প্রবণতায় এসেছে—আগের সময়ের ১১.৬ শতাংশ থেকে কমে গত জানুয়ারিতে দাঁড়িয়েছে ৮.৫৮ শতাংশে। যদিও এখনো তা তুলনামূলক উচ্চ, তবে নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
ডলার বাজার ও লেনদেন ভারসাম্যে পরিবর্তন
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা হলেও তা তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে (প্রতি ডলার ১২১–১২২ টাকা)। রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির পরিবর্তে বাজার থেকে ডলার কেনার নীতি নেওয়ায় মুদ্রাবাজারে আস্থা ফিরেছে।
বাণিজ্য ভারসাম্যেও উন্নতি হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৬০ কোটি ডলারের ঘাটতি থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৩২৯ কোটি ডলার উদ্বৃত্তে পরিণত হয়েছে—চার বছর পর এ ধরনের উদ্বৃত্ত দেখা গেল।
ব্যাংকিং খাতে বাস্তব চিত্র উন্মোচন
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় লুকানো খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসে। খেলাপি ঋণ প্রায় ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে প্রকাশিত হয়, যা পূর্বের তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি। দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে নতুন কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে খাতটি পুনর্গঠন করা যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং রিজার্ভের ওপর চাপ কমেছে। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পথে ফেরা সম্ভব।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে; এখন বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ
তবে স্থিতিশীলতার এ ভিত্তি ধরে রাখা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। রাজস্ব ঘাটতি ইতোমধ্যে বেড়েছে—চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা। বিদেশি ঋণ ৭৪.৩৪ বিলিয়ন ডলার এবং দেশি ঋণও বেড়ে প্রায় ১১.৯৫ ট্রিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া এলডিসি উত্তরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শেয়ারবাজার স্থিতিশীল করা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার বাস্তবায়ন—এসব ক্ষেত্রেও নতুন সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
