হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,
“ওই ব্যক্তির নাক মলিন হোক, যার কাছে আমার কথা আলোচনা করা হলো অথচ সে আমার ওপর দরুদ পাঠ করল না। ওই লোকের নাক মলিন হোক, যার কাছে রমজান মাস এলো, তারপর তাকে ক্ষমা করার পূর্বেই রমজান শেষ হয়ে গেল, অথচ সে ক্ষমাপ্রাপ্ত হলো না। ওই ব্যক্তির নাক মলিন হোক, যে তার মা-বাবাকে বার্ধক্য অবস্থায় পেয়েও তাকে জান্নাতে নিতে পারল না।” (তিরমিজি)
পবিত্র রমজান মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি নির্দেশনা রয়েছে এই হাদিসে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মা-বাবার সঙ্গে সদাচার করা এবং তাদের হক আদায়ের চেষ্টা করা। হাদিসটিতে মা-বাবার প্রতি করণীয় সম্পর্কে আলাদা করে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। কিন্তু একটি বাক্যের মধ্যেই এমন গভীর সত্য তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে আর কিছু বলার বাকি থাকে না।
এই হাদিসে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মা-বাবাই সন্তানের জান্নাত-জাহান্নামের পথ। তারা খুশি হলে আল্লাহ খুশি হন। আর আল্লাহ খুশি হলে জান্নাতই হয় মানুষের ঠিকানা। বিপরীতে তারা অসন্তুষ্ট হলে আল্লাহও অসন্তুষ্ট হন, আর আল্লাহ অসন্তুষ্ট হলে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
এই হাদিস আমাদের আরও মনে করিয়ে দেয় যে, রমজান মাস শুধু ইবাদত-বন্দেগির মাসই নয়; এটি মা-বাবার খেদমত করে জান্নাত অর্জনেরও এক মহামূল্যবান সুযোগ। তাই আমাদের উচিত সম্ভাব্য সব উপায়ে মা-বাবার সেবা ও যত্ন করা। তাদের খুশি করার মাধ্যমে যেন আমরা নিজেদের জান্নাত নিশ্চিত করতে পারি।
মা-বাবার সেবার প্রতিদান শুধু পরকালের জান্নাতেই সীমাবদ্ধ নয়; পার্থিব জীবনেও মানুষের সাফল্যের পেছনে তাদের দোয়া বড় ভূমিকা রাখে। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে। একদিন ছেলেকে আদর করতে দেখে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের উদ্দেশে তার মা বলেছিলেন, “শিশুসুলভ আচরণ করো না। তুমি এখন রাষ্ট্রপ্রধান। তোমার পক্ষে আমার পা ছুঁয়ে সালাম করা শোভন নয়।”
তখন তিনি হাসিমুখে জবাব দিয়েছিলেন, “কেন, প্রেসিডেন্টদের জন্য কি জান্নাত হারাম করে দেওয়া হয়েছে?”
মায়ের প্রতি এমন আন্তরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাই হয়তো তাকে জীবনের উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
আমরা বাংলাদেশের সাবেক ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মরহুম আনিসুল হকের কথাও স্মরণ করতে পারি। তার মৃত্যুর পর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দেওয়া তার একটি বক্তৃতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। সেই বক্তৃতায় তিনি নিজের ও তার সেনাপ্রধান ভাইয়ের জীবনের সাফল্যের পেছনে মা-বাবার দোয়ার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলেন। তরুণদের সামনে তিনি আবেগঘন ভাষায় বলেছিলেন, জীবনে সত্যিকারের সাফল্য পেতে হলে মা-বাবার দোয়া অপরিহার্য।
পৃথিবীতে মহান আল্লাহর পর মানুষের সবচেয়ে আপন হলেন মা-বাবা। তাই আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে তাদের সম্পর্কে বলেছেন:
“তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উহ’ শব্দটিও বলো না, তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনকভাবে কথা বলো। ভালোবাসার সঙ্গে তাদের সামনে নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বল: হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।”
(সুরা ইসরা: ২৩–২৪)
এই আয়াতে আল্লাহ আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন মা-বাবার জন্য একটি অসাধারণ দোয়া:
“রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানি ছগিরা।”
অর্থাৎ, “হে আমার পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম করুন, যেমন তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।”
দোয়াটি আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু এই ছোট বাক্যের গভীর অর্থ কতজন সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করি? সন্তানের জন্য মা-বাবা কত কষ্ট, ত্যাগ আর তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে জীবন কাটান—তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। অনেক সময় তারা নিজেরাও ভুলে যান, কত ত্যাগের বিনিময়ে সন্তানকে বড় করে তুলেছেন।
সন্তান বড় করতে গিয়ে যখন নিজেরা সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাই, তখনই আমরা উপলব্ধি করি বাবা-মায়ের সেই অগণিত ত্যাগ। তখন মনে হয়, আমাদের জন্য তারা যেন ত্যাগের এক বিশাল পাহাড় অতিক্রম করেছেন। আর সেই দীর্ঘ ও গভীর অনুভূতির সারমর্ম যেন লুকিয়ে আছে এই ছোট্ট দোয়াটির মধ্যেই—
“রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানি ছগিরা।”
তাই জীবন গড়ার এই বরকতময় মাসে আমাদের চেষ্টা করা উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পাশাপাশি মা-বাবার সন্তুষ্টি অর্জন করা। আর যদি তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে থাকেন, তবে তাদের জন্য আন্তরিকভাবে এই দোয়াটি পাঠ করা—এটিও সন্তানের দায়িত্ব ও ভালোবাসার প্রকাশ।
