বিশ্বের অন্যতম উন্নত অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাজ্যে আধুনিক দাসপ্রথা ও শ্রম শোষণের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। মানবাধিকার সংগঠন ও সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, হাজার হাজার মানুষ—বিশেষ করে অভিবাসী শ্রমিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা স্থানীয় নাগরিকরা—জবরদস্তিমূলক শ্রম ও অমানবিক শোষণের শিকার হচ্ছেন।
যুক্তরাজ্যের হোম অফিস এবং মানব পাচারবিরোধী সংগঠন Stop the Traffik-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ‘ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজম’ (NRM)-এর মাধ্যমে আধুনিক দাসপ্রথার সম্ভাব্য শিকার হিসেবে শনাক্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
শিকারদের বড় অংশ এসেছেন দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে—যার মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আলবেনিয়া, রোমানিয়া ও ভিয়েতনাম উল্লেখযোগ্য। তবে এখন শুধু বিদেশি নাগরিক নয়, আর্থিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল ব্রিটিশ তরুণরাও এই শোষণের ফাঁদে পড়ছেন বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।
যেসব খাতে সবচেয়ে বেশি শোষণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি খাত এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কেয়ার সেক্টরে অনেক অভিবাসী শ্রমিকের কাছ থেকে ভিসা স্পনসরশিপের নামে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর তাদের দিয়ে অতিরিক্ত সময় কাজ করানো, কম বেতন দেওয়া বা কোনো বেতন না দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।
কৃষি ও মৌসুমি শ্রম খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা হয় এবং তাদের পাসপোর্ট আটকে রেখে কাজ করানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আতিথেয়তা খাত—যেমন রেস্তোরাঁ, কার ওয়াশ ও নেইল সেলুন—এও অবৈধ কাগজপত্রের ভয় দেখিয়ে শ্রমিকদের শোষণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া অপরাধচক্রের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা ও অবৈধ গাঁজা খামারে জোরপূর্বক শ্রম করানোর ঘটনাও বাড়ছে।
কেন বাড়ছে এই সংকট
বিশ্লেষকদের মতে, শ্রমিক সংকট ও ভিসা ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশেষ করে হেলথ অ্যান্ড কেয়ার ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার করে কিছু অসাধু এজেন্সি বিদেশি শ্রমিকদের এনে শোষণের মধ্যে ফেলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আরেকটি বড় কারণ হলো ঋণের ফাঁদ। অনেক শ্রমিক নিজ দেশে দালালদের কাছ থেকে বিপুল ঋণ নিয়ে যুক্তরাজ্যে আসেন। পরে সেই ঋণ শোধের চাপে তারা শোষণের শিকার হলেও প্রতিবাদ করতে পারেন না।
ডিপোর্টেশনের ভয়ও বড় ভূমিকা রাখছে। অনেক অভিবাসী মনে করেন অভিযোগ করলে তারা আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন বা দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে পারেন।
সমাজ ও অর্থনীতিতে প্রভাব
এই সংকট শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় নয়, এটি অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি। অবৈধ সস্তা শ্রম বৈধ ব্যবসার জন্য অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে এবং সরকারের রাজস্ব ক্ষতিও বাড়াচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, শুধু আইন করলেই হবে না—কার্যকর নজরদারি, শ্রমিক সুরক্ষা এবং নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সমাধানে কী প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেয়ার এজেন্সি ও শ্রম নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নজরদারি বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীরা যাতে ভয় ছাড়া অভিযোগ করতে পারেন, সেই নিরাপদ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
বিভিন্ন ভাষায় সচেতনতা কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান বাড়ানোর দাবিও উঠছে।
ব্রিটেনে আধুনিক দাসপ্রথার বিস্তার এখন শুধু আইনি নয়, একটি গভীর মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও দুর্বল প্রয়োগ ও নজরদারির ঘাটতির কারণে বহু মানুষ এখনো শোষণের শিকার হচ্ছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
