বিশ্বের অন্যতম ধনী ও উন্নত অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাজ্য এখন বাড়তে থাকা দারিদ্র্য, খাদ্য সংকট এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। দেশজুড়ে লাখো মানুষ এখন সরকারি বেনিফিট এবং ফুডব্যাংকের সহায়তা ছাড়া দৈনন্দিন জীবন চালাতে পারছেন না।
যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ওয়ার্ক অ্যান্ড পেনশনস (DWP) এবং দারিদ্র্যবিরোধী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কোটি মানুষ ইউনিভার্সাল ক্রেডিট, পিআইপি এবং অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার ওপর নির্ভরশীল। জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, সাধারণ মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি।
অন্যদিকে Trussell Trust জানিয়েছে, প্রায় ৩০ লাখ মানুষ—যাদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক শিশু রয়েছে—খাদ্য সংকটে ভুগছেন এবং জরুরি খাদ্য সহায়তার জন্য ফুডব্যাংকের দ্বারস্থ হচ্ছেন। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, গত বছর তারা ২৬ লাখের বেশি জরুরি খাদ্য পার্সেল বিতরণ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ এখন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
বাড়িভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুতের বিল এবং নিত্যপণ্যের দাম একের পর এক বেড়েছে। কিন্তু মানুষের বেতন ও সরকারি সহায়তা সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের বহু পরিবার এখন টিকে থাকতেই হিমশিম খাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—ফুডব্যাংকের লাইনে এখন শুধু বেকার মানুষ নন, চাকরিজীবীরাও দাঁড়াচ্ছেন। কম মজুরি, অস্থায়ী চাকরি এবং ‘জিরো-আওয়ার’ চুক্তির কারণে কাজ করেও অনেকের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
দাতব্য সংস্থা ও সমাজনীতি বিশেষজ্ঞদের দাবি, বর্তমান বেনিফিট ব্যবস্থা মানুষের ন্যূনতম জীবনযাত্রার খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
তাদের মতে, ইউনিভার্সাল ক্রেডিটসহ বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ এত কম যে খাদ্য, বাসাভাড়া ও জ্বালানির মৌলিক ব্যয় বহন করাও অনেক পরিবারের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছে শিশুরা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফুডব্যাংক থেকে দেওয়া খাদ্য সহায়তার প্রায় ৪২ শতাংশই শিশুদের জন্য যাচ্ছে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে প্রায় সাড়ে ৪ মিলিয়ন শিশু দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
Save the Childrenসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন সতর্ক করেছে, দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি ও আর্থিক সংকট শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান লেবার সরকার শিশু দারিদ্র্য কমানো এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বলেছে। তবে সমালোচকদের মতে, এখন পর্যন্ত নেওয়া পদক্ষেপ সংকটের তুলনায় খুবই সীমিত।
Trussell Trust-এর নীতিনির্ধারণ পরিচালক হেলেন বার্নার্ড পরিস্থিতিকে বিশ্বের ধনী দেশগুলোর জন্য “লজ্জাজনক বাস্তবতা” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি এমন একটি “এসেনশিয়ালস গ্যারান্টি” চালুর দাবি জানিয়েছেন, যাতে অন্তত মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত বেনিফিট নিশ্চিত করা যায়।
একসময়ের শিল্প বিপ্লবের দেশ ও আধুনিক কল্যাণকামী রাষ্ট্রের রোল মডেল ব্রিটেন আজ যেন দুই ভিন্ন বাস্তবতার দেশ। একদিকে লন্ডনের আধুনিক চকমকে বহুতল ভবন, অন্যদিকে ভোরের আলো ফোটার আগেই ফুডব্যাংকের সামনে ক্ষুধার্ত মানুষের দীর্ঘ লাইন। এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল সাময়িক অনুদান নয়, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বেনিফিট ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, জীবনযাত্রার ব্যয় ও বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থানের স্থিতিশীলতা এবং মজুরি বৃদ্ধির মতো কাঠামোগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ‘উন্নত ব্রিটেন’ কাগজের কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, আর বাস্তবতায় কোটি মানুষ নিমজ্জিত হবে চরম দারিদ্র্যে।
