অশাসনযোগ্য ব্রিটেন? কেন বারবার পতন হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীদের

ব্রিটেনের রাজনীতিতে যেন এখন এক অদ্ভুত অস্থিরতার যুগ চলছে। ডেভিড ক্যামেরনের পর থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক এবং এখন কিয়ার স্টারমারও চাপে। একের পর এক প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এসে টিকতে পারছেন না দীর্ঘদিন। প্রশ্ন উঠছে, সমস্যা কি শুধু নেতাদের, নাকি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদটিই এখন কার্যত “অসম্ভব অফিস” হয়ে উঠেছে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে অনেকটা মিল রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ফ্রান্সের চতুর্থ প্রজাতন্ত্রের। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৮ পর্যন্ত ফ্রান্সে সরকার বদল, রাজনৈতিক বিভাজন এবং নীতিগত অচলাবস্থা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত শার্ল দ্য গলকে নতুন রাজনৈতিক কাঠামো গড়ার দায়িত্ব দিতে হয়।

ব্রিটেনেও গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রীদের দ্রুত পরিবর্তন নজিরবিহীন। ২০১৬ সালের পর থেকে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বে এসেছেন। একই সময়ে বদলেছেন একাধিক অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীও। ফলে দীর্ঘমেয়াদি নীতি বাস্তবায়ন কার্যত বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

সাবেক ক্যাবিনেট সেক্রেটারি গাস ও’ডনেল বলেন, “মন্ত্রীদের একই দপ্তরে দীর্ঘ সময় থাকা দরকার, যাতে তারা অন্তত নিজেদের কাজ বুঝে উঠতে পারেন।” কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই দেখা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে ঘন ঘন রদবদল হচ্ছে। এক পর্যায়ে মাত্র পাঁচ বছরে নয়জন পেনশনমন্ত্রী বদলানোর ঘটনাও ঘটেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রধানমন্ত্রী এলেই পুরো মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। নতুন মুখ, নতুন উপদেষ্টা এবং নতুন অগ্রাধিকার নিয়ে সরকার শুরু করলেও অভিজ্ঞতার অভাব ও রাজনৈতিক চাপের কারণে ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।

ইনস্টিটিউট ফর গভর্নমেন্টের গবেষক ক্যাথ হ্যাডন মনে করেন, একজন প্রধানমন্ত্রীকে কাজ শেখা, নীতি বাস্তবায়ন এবং ফল দেখানোর জন্য সময় দেওয়া জরুরি। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে “চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী মানেই বিদায়” এমন ধারণা দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

থেরেসা মের সময়ও একই চিত্র দেখা যায়। ২০১৭ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর থেকেই তার সরকারের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় শুধু ব্রেক্সিট চুক্তি সম্পন্ন করা। ফলে সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা বা সামাজিক যত্নের মতো বড় সংস্কারগুলো থমকে যায়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বড় বড় ভাষণ বা স্লোগান বাস্তব পরিবর্তন আনে না। কার্যকর সংস্কারের জন্য দরকার দীর্ঘ পরিকল্পনা, আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। কিন্তু ব্রিটিশ রাজনীতিতে এখন সেই স্থিতিশীলতারই সবচেয়ে বড় সংকট চলছে।