রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিদায়: তিন সরকারের শপথ থেকে পদত্যাগ পর্যন্ত বিতর্কে ঘেরা অধ্যায়ের অবসান

আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাংবিধানিক বিতর্ক, এবং বিএনপি সরকারের আমলে পদত্যাগ। প্রায় তিন বছর তিন মাসের দায়িত্ব শেষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বঙ্গভবনের অধ্যায় শেষ হলো নানা রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের মধ্য দিয়ে।

দায়িত্ব পালনকালে তিনি তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রধানদের শপথ পড়ান তিনি। তবে শুরু থেকেই তার রাজনৈতিক পরিচয়, নিরপেক্ষতা এবং সাংবিধানিক ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ও বিতর্ক ছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারণের আলোচনা সামনে এলেও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার যুক্তিতে বিএনপি তার পদে বহাল থাকার পক্ষে অবস্থান নেয়। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পরও তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন।

নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের মাত্র ১০ দিন পর এক সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন জানান, কঠিন সময়ে বিএনপি এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তার পাশে ছিল। তিনি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে আন্তরিক মানুষ বলেও উল্লেখ করেন। তবে পরবর্তী সময়ে বঙ্গভবন ও সরকারের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বঙ্গভবন-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকেই তাকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয়।

রাজনৈতিক পরিচয় ও আইনি বিতর্ক

২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তার নাম রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত হিসেবে ঘোষণা করেন।

জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, ছাত্রজীবনে তিনি পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, পরে যুবলীগের সভাপতি এবং ১৯৮০ সালে জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর তিনি তিন বছর কারাবন্দি ছিলেন।

তার এই রাজনৈতিক অতীত রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেয়। পাশাপাশি ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের কারণে তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার বৈধতা নিয়েও আইনি প্রশ্ন ওঠে। যদিও উচ্চ আদালত রাষ্ট্রপতির পদকে “লাভজনক পদ” নয় বলে উল্লেখ করে তার নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিট খারিজ করে দেন।

শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে বিতর্ক

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে রাষ্ট্রপতি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন।

কিন্তু পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, তার কাছে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্রের কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। এই বক্তব্য দেশজুড়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা তার সমালোচনা করেন। এমনকি বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচি ও তার পদত্যাগের দাবিও ওঠে। পরে বঙ্গভবন এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক না করার আহ্বান জানায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন অভিযোগ করেন, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের কারণে তিনি নিজেকে “অপমানিত” মনে করছেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সাত মাস প্রধান উপদেষ্টা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। এছাড়া রাষ্ট্রপতির প্রেস বিভাগ সরিয়ে নেওয়া এবং বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো থেকে তার প্রতিকৃতি অপসারণের বিষয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তার কণ্ঠরোধের চেষ্টার অভিযোগও তোলেন।

বিতর্কের মধ্যেই অধ্যায়ের সমাপ্তি

রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্ন, আইনি বিতর্ক, শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে টানাপোড়েনসহ একাধিক ঘটনায় আলোচিত ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। সবশেষে বিএনপি সরকারের আমলেই পদত্যাগের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার দায়িত্বের ইতি ঘটল। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়েরও সমাপ্তি হলো।

সূত্র: বিবিসি বাংলা