সেমিকন্ডাক্টরে চীনের দ্রুত উত্থান, প্রযুক্তিগত আধিপত্য হারানোর শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র

নিজস্ব লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি ও উন্নত চিপ উৎপাদনে অগ্রগতি, বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত

দীর্ঘদিন ধরে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর প্রাধান্য থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে চীনের ধারাবাহিক অগ্রগতি বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিজস্ব প্রযুক্তিতে উন্নত লিথোগ্রাফি মেশিন উৎপাদন এবং চিপ নির্মাণে সাফল্য সেমিকন্ডাক্টর খাতে নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন প্রথমবারের মতো নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ইমার্শন ডিপ আল্ট্রাভায়োলেট বা ডিইউভি লিথোগ্রাফি মেশিনের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সাংহাই আইশেংনা ইলেকট্রনিক টেকনোলজি গ্রুপ এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি চীনের বিভিন্ন লিথোগ্রাফি কোম্পানির প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে প্রযুক্তিটি উন্নয়ন করেছে।

এদিকে, চীনের গবেষকেরা দাবি করেছেন, তারা নিজস্ব এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট বা ইইউভি লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি উন্নয়নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন। এ উদ্যোগ সফল হলে তা গত কয়েক দশকের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ডিইউভি ও ইইউভি প্রযুক্তি

উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ প্রকৌশল কৌশল ব্যবহার করে ডিইউভি প্রযুক্তির মাধ্যমে ৭ ন্যানোমিটার পর্যন্ত চিপ উৎপাদন সম্ভব হলেও ২, ৩ ও ৫ ন্যানোমিটারের অত্যাধুনিক প্রসেসর তৈরিতে ইইউভি প্রযুক্তি প্রায় অপরিহার্য।

উন্নত লিথোগ্রাফি যন্ত্রের বাণিজ্যিক বাজারে দীর্ঘদিন ধরে নেদারল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠান এএসএমএল-এর কার্যত একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তৈরি ইইউভি মেশিন বিশ্বের সবচেয়ে জটিল ও উন্নত শিল্পযন্ত্রগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়।

নিষেধাজ্ঞার পরও থামেনি চীনের অগ্রগতি

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলেও চীনের কাছে উন্নত চিপ, চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যার রপ্তানিতে একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর ফলে হুয়াওয়ে এবং সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন বা এসএমআইসির মতো প্রতিষ্ঠান উন্নত বিদেশি প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার হারায়।

তবে নিষেধাজ্ঞার পর চীন সেমিকন্ডাক্টর খাতকে জাতীয় কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে। গবেষণা, উৎপাদন, যন্ত্রপাতি, উপকরণ এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে দেশটি বিপুল বিনিয়োগ করেছে।

হুয়াওয়ের ৭ ন্যানোমিটার চিপ ছিল বড় বার্তা

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী জিনা রাইমন্ডোর চীন সফরের সময় হুয়াওয়ে তাদের ‘মেট ৬০ প্রো’ স্মার্টফোন উন্মোচন করে। পরে বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফোনটিতে ব্যবহৃত ৭ ন্যানোমিটার প্রসেসরটি চীনের প্রতিষ্ঠান এসএমআইসি তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনের পক্ষে এমন উন্নত চিপ তৈরি করা সম্ভব হবে না বলে অনেকেই ধারণা করেছিলেন।

পূর্ণাঙ্গ সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে বেইজিং

চীনের লক্ষ্য শুধু একটি বা দুটি সফল চিপ কোম্পানি গড়ে তোলা নয়। দেশটি চিপ ডিজাইন, উৎপাদন যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও উপকরণ, মেমোরি চিপ এবং ফ্যাব্রিকেশনসহ পুরো সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে সমান্তরালভাবে বিনিয়োগ করছে।

এরই মধ্যে চ্যাংজিন মেমরি টেকনোলজিস বা সিএক্সএমটি দ্রুত বিশ্বের অন্যতম বড় ডিআরএএম মেমোরি চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি ইয়াংজি মেমরি টেকনোলজিস বা ওয়াইএমটিসি উন্নত এনএএনডি ফ্ল্যাশ মেমোরি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে।

পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

চীন ভবিষ্যতে নিজস্ব লিথোগ্রাফি প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারলে বিশ্বের অন্যতম বড় বাজারে এএসএমএল-এর অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপ্লায়েড ম্যাটেরিয়ালস, ল্যাম রিসার্চ এবং কেএলএ-এর মতো চিপ উৎপাদন সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের মতো মেমোরি চিপ নির্মাতারাও চীনের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

দুই ভাগে বিভক্ত হতে পারে বৈশ্বিক চিপ শিল্প

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্প দুটি পৃথক প্রযুক্তিগত ইকোসিস্টেমে বিভক্ত হতে পারে। একটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর নেতৃত্বে এবং অন্যটি চীনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে।

তবে উন্নত চিপ ডিজাইনে যুক্তরাষ্ট্র, অত্যাধুনিক চিপ উৎপাদনে তাইওয়ানের টিএসএমসি এবং ইইউভি প্রযুক্তিতে এএসএমএল এখনো বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা

বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখনো বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর দৌড়ে শীর্ষে পৌঁছায়নি। তবে দেশটির সাম্প্রতিক অগ্রগতি দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে একটি দেশের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদে থামিয়ে রাখা কঠিন।

ফলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রভাবের পাশাপাশি চীনের উত্থানও এখন বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। আগামী বছরগুলোতে এই প্রতিযোগিতা শুধু চিপ প্রযুক্তির বাজারকেই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি, সরবরাহব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত ভূরাজনীতিকেও নতুনভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি