শাহজালাল বিমানবন্দরে আসছে বড় পরিবর্তন, ২০২৬ সালেই চালু তৃতীয় টার্মিনাল, যাত্রীরা পাবেন যেসব সুবিধা

লাগেজ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি, বাড়ছে নজরদারি ও সেবার মান; ২০২৬ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্য শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনাল

বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীসেবা উন্নয়ন, লাগেজ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিমানবন্দরে নতুন সেবাসংস্কৃতি গড়ে তোলার পাশাপাশি জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর আধুনিকায়ন ও দেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করার লক্ষ্যেও কাজ চলছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বাসসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, বিমানবন্দরের বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি যাত্রীদের জন্য আধুনিক, দ্রুত ও ঝামেলামুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে সরকার একাধিক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, “আমরা শুধু সমস্যা সমাধান করছি না; বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোতে একটি নতুন সেবাসংস্কৃতি গড়ে তুলছি।”

মন্ত্রী জানান, লাগেজ ব্যবস্থাপনা, বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা এবং ইমিগ্রেশন সেবা নিয়ে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। এসব সমস্যা সমাধানে দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আচরণবিধি বা কোড অব কন্ডাক্ট চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করছেন।

লাগেজের নিরাপত্তা ও দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিমানবন্দরগুলোতে ভিজিল্যান্স টিম, বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা, সিসিটিভি নজরদারি এবং ব্যাগেজ রিকনসিলিয়েশন সিস্টেম চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে যাত্রীদের লাগেজ পেতে অপেক্ষার সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে বলে জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, আধুনিক গ্রাউন্ড-হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি, অতিরিক্ত জনবল এবং প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে বিমানবন্দরের সেবার মান আরও উন্নত করা হচ্ছে। দ্রুত ও নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, এয়ারলাইন্স এবং বিমানবন্দরের অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ও জোরদার করা হয়েছে।

যাত্রীরা যেসব সুবিধা পাবেন

সরকারের চলমান সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে যাত্রীরা যেসব সুবিধা পেতে পারেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • লাগেজ দ্রুত সরবরাহ ও উন্নত ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা
  • লাগেজ নিরাপত্তায় বাড়তি নজরদারি
  • বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা ও সিসিটিভির মাধ্যমে জবাবদিহিতা বৃদ্ধি
  • ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস সেবায় উন্নত সমন্বয়
  • প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুত যাত্রীসেবা
  • বিমানবন্দরে শৃঙ্খলা ও সেবার মানোন্নয়ন
  • আধুনিক গ্রাউন্ড-হ্যান্ডলিং সুবিধা
  • বিভিন্ন বিমানবন্দর সেবার ধাপে ধাপে ডিজিটালাইজেশন

২০২৬ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্য তৃতীয় টার্মিনাল

বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতে বড় পরিবর্তনের অন্যতম উদ্যোগ হিসেবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতি চলছে। আফরোজা খানম জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ১৬ ডিসেম্বর ২০২৬ সালের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।

তিনি বলেন, “তৃতীয় টার্মিনাল শুধু আরেকটি টার্মিনাল নয়; এটি বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি।” সরকারের আশা, নতুন টার্মিনাল চালু হলে যাত্রীসেবার মান বাড়বে, বিমানবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা আরও এগিয়ে যাবে।

বিমানের বহরে যুক্ত হবে ২৪টি নতুন উড়োজাহাজ

জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর আধুনিকায়নের উদ্যোগও সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।

মন্ত্রী জানান, বিমানের বহরে নতুন ২৪টি উড়োজাহাজ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি বোয়িং এবং ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ থাকবে। ধাপে ধাপে এসব উড়োজাহাজ যুক্ত করে বিমানকে আধুনিক মিশ্র বহরের একটি আন্তর্জাতিক মানের এয়ারলাইন্সে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া চলতি বছর আরও পাঁচটি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ৪০টি প্রতিষ্ঠান উড়োজাহাজ সরবরাহে আবেদন করেছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বিমানের বহর ৪৭টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং জ্বালানি-সাশ্রয়ী, ব্যয়-সাশ্রয়ী এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম একটি জাতীয় বিমান সংস্থা গড়ে তোলা।

নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্য নিয়ে পরিকল্পনা

বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য বাহরাইন, মালে, জাকার্তা, সিউল, সিডনি, কুনমিং ও নিউইয়র্কসহ কয়েকটি নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করছে সরকার।

তবে নতুন রুট চালুর সিদ্ধান্ত বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, যাত্রী চাহিদা, দ্বিপক্ষীয় আকাশ পরিবহন চুক্তি এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে।

এক বছরের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তনের আশা

মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, আগামী এক বছরের মধ্যেই বিমানবন্দর ও পর্যটন খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে পাবেন মানুষ।

এর মধ্যে রয়েছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু, বিমানবন্দরের সেবার মানোন্নয়ন, বিভিন্ন সেবার ডিজিটালাইজেশন, ভিসা নীতিমালা-২০২৬ বাস্তবায়নে অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক পর্যটনে বাংলাদেশের শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে নিরাপদ, আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানের বিমান পরিবহন ও পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা।