১০৪ জনকে গুম করে হত্যার মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ দেওয়া সাক্ষ্যে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া র্যাব ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর গুম-খুনের ভয়াবহ সংস্কৃতির চিত্র তুলে ধরেছেন।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিচারপতি গোলাম মতুর্জা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, র্যাবে কর্মরত কিছু সেনা কর্মকর্তা ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে মানুষ হত্যা করতেন। হত্যার পর লাশের পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করে ইট-পাথর বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।
তিনি বলেন, এই কর্মকাণ্ড বন্ধ করা না গেলে র্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা উচিত। তা সম্ভব না হলে র্যাবে কর্মরত সেনাসদস্যদের সামরিক বাহিনীতে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে ডিজিএফআই বিলুপ্ত করারও আহ্বান জানান সাবেক এই সেনাপ্রধান। তার ভাষায়, হত্যার মতো অপসংস্কৃতির জন্ম দেওয়ার পর ডিজিএফআই টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে।
২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজত ইসলামের সমাবেশে নিহতদের প্রসঙ্গ টেনে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, তিনি বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছেন, সে সময় র্যাব যাদের হত্যা করত তাদের লাশ একই কায়দায় নদীতে ফেলা হতো। এসব কর্মকাণ্ড দেখে তিনি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ডিভিশন ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন শুরু করেন এবং অফিসারদের এমন কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য মোটিভেট করার উদ্যোগ নেন।
তিনি বলেন, একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর সব অফিসারকে ঢাকায় এনে জুনিয়র অফিসারদের দায়িত্ব ও পরিণতির বিষয়ে সতর্ক করা হয়। তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, শেখ মুজিব ও জিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত অনেক সামরিক কর্মকর্তার ফাঁসি হয়েছে এবং দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায়ও কয়েকজন কর্মকর্তা ফাঁসির দণ্ড নিয়ে কারাগারে রয়েছেন।
এরপরও যখন ক্রসফায়ার বন্ধ হচ্ছিল না, তখন ডিজিএফআই, বিজিবি ও র্যাব থেকে সেনা কর্মকর্তাদের পোস্টিং বন্ধ করে দেন বলে জানান তিনি। এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই বিদ্রোহ হিসেবে দেখেছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি মনে করেছেন, শেষ বিচারের দিনে আল্লাহর কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।
সাক্ষ্যে তিনি আরও বলেন, পোস্টিং বন্ধ করার কারণে তার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করা হয়। চট্টগ্রামের রেডিসন হোটেল উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে পুলিশের বৈঠকে তাকে ডেকে র্যাবে অফিসার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি অফিসার স্বল্পতার কথা জানিয়ে সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন এবং অবসর গ্রহণ পর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত ছিল।
র্যাবের কর্মকাণ্ডের কারণে নিজের দায়িত্বকালকে অত্যন্ত কষ্টদায়ক বলে বর্ণনা করে তিনি বলেন, কিছু করতে না পারার বেদনা তাকে দীর্ঘদিন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। এখন সেই অপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ এসেছে।
সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আত্মশুদ্ধির যে সুযোগ এসেছে, তা অবহেলা করা উচিত নয়। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুণ্ন হবে না, বরং আরও উজ্জ্বল হবে। পুরো জাতি জানবে, সেনাবাহিনী কখনও অপরাধীদের রক্ষা করে না।
শেষে তিনি আবারও র্যাব ও ডিজিএফআই বিলুপ্তির দাবি জানিয়ে বলেন, আয়নাঘরের মতো অপসংস্কৃতি জন্ম দেওয়ার পর এসব প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার নৈতিক ভিত্তি নেই।
