আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ এবং ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদা মোকাবিলায় ২০২৭ সালের মধ্যে লিজে (ভাড়ায়) সর্বোচ্চ ১০টি উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজের বহর বেড়ে ২৯টিতে পৌঁছাবে, যা সংস্থাটির সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সক্ষমতা সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
রোববার বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, প্রাথমিকভাবে তিনটি উড়োজাহাজ ড্রাই লিজে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ এবং পরিচালনাগত চাহিদার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে এই সংখ্যা ১০টিতে উন্নীত করা হতে পারে।
তিনি বলেন, নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো, নতুন গন্তব্যে সেবা চালু এবং যাত্রীসেবার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।
স্বচ্ছ লিজ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক পরামর্শক
প্রতিমন্ত্রী জানান, পুরো লিজ প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে একজন আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৪০টি আবেদন জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে একটি যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন করে লিজ কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হবে।
নতুন বোয়িং আসবে ২০৩১ থেকে
বিমানের দীর্ঘমেয়াদি বহর উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় ১৪টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এসব উড়োজাহাজ ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে সরবরাহ করা হবে।
সরকার বলছে, বিশ্ববাজারে বোয়িং ও এয়ারবাসের নতুন উড়োজাহাজ তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ সম্ভব না হওয়ায় অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে আন্তর্জাতিক লিজ বাজার থেকে উড়োজাহাজ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনারের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র
ইতোমধ্যে বিমান ছয় বছরের জন্য তিনটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার ড্রাই লিজে নেওয়ার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। গত ১৫ জুলাই প্রকাশিত রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) অনুযায়ী, উড়োজাহাজের মালিক, নির্মাতা, অপারেটর এবং লিজিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে।
ড্রাই লিজের আওতায় বিমান নিজস্ব পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী ও পরিচালন ব্যবস্থার মাধ্যমে উড়োজাহাজ পরিচালনা করবে। অর্থাৎ লিজদাতা প্রতিষ্ঠান কেবল উড়োজাহাজ সরবরাহ করবে, ক্রু, রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা বীমা দেবে না।
প্রস্তাব জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ৯ আগস্ট। বিমানের লক্ষ্য, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে উড়োজাহাজগুলো পরিচালনায় আনা। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরবরাহ করা উড়োজাহাজও গ্রহণযোগ্য হবে।
কঠোর কারিগরি শর্ত
বিমান জানিয়েছে, প্রতিটি উড়োজাহাজ বছরে প্রায় ৪ হাজার ঘণ্টা ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা থাকতে হবে। ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে উড়োজাহাজের বয়স ১৫ বছরের বেশি হওয়া যাবে না। এগুলোতে জিইএনএক্স-১বি৭৪/৭৫ ইঞ্জিন থাকতে হবে এবং দুই শ্রেণির কেবিন বিন্যাসে ৩০০টির বেশি আসনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বর্তমান বহর ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বর্তমানে বিমানের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর, চারটি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার, চারটি বোয়িং ৭৩৭ এবং পাঁচটি ড্যাশ ৮-৪০০ টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজ।
সরকার একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বহর কৌশলের অংশ হিসেবে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করছে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, ভবিষ্যতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই মিশ্র বিমানবহর গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য।
প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে বর্তমানে বহর সম্প্রসারণে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ২০২৭ সালে ২১টি বোয়িং ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ লিজে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া এয়ার অ্যাস্ট্রা ও নভোএয়ারও আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণে বহর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
এভিয়েশন বিশ্লেষক এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক যাত্রীবাজারে প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিযোগিতামূলক লিজ রেটে আধুনিক উড়োজাহাজ সংগ্রহ করতে পারলে বিমান নতুন রুট সম্প্রসারণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবে।
নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত লিজে উড়োজাহাজ সংগ্রহের এই উদ্যোগ বিমানের পরিচালন সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং যাত্রীসেবা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
