দিল্লিতে শিক্ষার্থী আন্দোলনে পুলিশি দমন: অমিত শাহর পদত্যাগের দাবি অব্যাহত রাখার ঘোষণা

গত ২০ জুলাই প্রশ্নপত্র ফাঁসবিরোধী আন্দোলনে দিল্লিতে পুলিশের কথিত দমন-পীড়নের ঘটনায় ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পদত্যাগের দাবি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা। একই সঙ্গে দিল্লি পুলিশের কমিশনার অনুরাগ কুমারকে অপসারণ এবং গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

বার্তা সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেহা বলেন, ২০ জুলাইয়ের ঘটনার পর আন্দোলনটি আর শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসের ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন দিল্লি পুলিশের ভূমিকা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

২৩ দিন অনশন পালন করা নেহা বলেন, এ ঘটনায় কেবল নিম্নপদস্থ কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট হবে না। রাজনৈতিক দায়ভার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং দিল্লি পুলিশের কমিশনারের ওপরই বর্তায়।

তিনি বলেন, “দায় শেষ পর্যন্ত অমিত শাহ এবং পুলিশ কমিশনারের ওপরই বর্তায়। যদি কারও পদত্যাগ বা অপসারণ প্রয়োজন হয়, তবে তা তাদেরই হওয়া উচিত। নিম্নপদস্থ কোনো কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়।”

নেহার অভিযোগ, ২০ জুলাই যন্তর মন্তর থেকে সংসদ অভিমুখে পদযাত্রার সময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পেলেট গান, কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের মতো অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে কেন পেলেট গান এবং পেরেক লাগানো লাঠি দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে সরকার এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

তার ভাষায়, “আমরা এখনো জানতে চাই, কেন বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পেলেট গান ব্যবহার করা হলো? কেন নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এসব অস্ত্র দেওয়া হয়েছিল?”

নেহা বলেন, এসব পদক্ষেপ যদি কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে নেওয়া হয়ে থাকে, তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আর যদি কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় দমননীতির প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

তার দাবি, ২০ জুলাইয়ের ঘটনার পর আন্দোলনের চরিত্র বদলে গেছে। শুরুতে এটি ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলন। তবে এখন এটি সাধারণ মানুষের প্রতি সরকারের আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

নেহার মতে, অনেক মানুষ তাদের কাছে এসে জানিয়েছেন, তারা আগে বিজেপিকে ভোট দিলেও শিক্ষার্থীদের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে হতাশ ও লজ্জিত।

তিনি বলেন, “এটি আর শুধু ধর্মেন্দ্র প্রধানকে নিয়ে আন্দোলন নয়। প্রশ্ন হলো, একটি সরকার কি দেশের সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে এতটা নির্মম আচরণ করতে পারে?”

আন্দোলনের অংশ হিসেবে গ্রেপ্তার শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিকেও সমান গুরুত্ব দেন নেহা। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আশ্বাস দেওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার ও মামলা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার প্রশংসা করে নেহা বলেন, জনগণের দাবি সংসদে তুলে ধরা এবং আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব। কংগ্রেস, এনএসইউআই ও যুব কংগ্রেসসহ বিভিন্ন সংগঠনের সমর্থনকে তিনি স্বাগত জানান।

আসন্ন নির্বাচনে এই আন্দোলনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি নেহা। তবে তার বিশ্বাস, দেশের মানুষ ২০ জুলাইয়ের ঘটনা এবং শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন সহজে ভুলবে না।

তিনি জানান, ২০ জুলাইয়ের পুলিশি অভিযানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অমিত শাহর পদত্যাগ, দিল্লি পুলিশের কমিশনারকে অপসারণ এবং গ্রেপ্তার আন্দোলনকারীদের মুক্তির দাবিতে দেশজুড়ে কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

উল্লেখ্য, ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সমর্থনে প্রশ্নপত্র ফাঁসবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা প্রথমে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন।

গত ২০ জুলাই যন্তর মন্তর থেকে সংসদ অভিমুখে পদযাত্রার সময় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পুলিশ পেলেট গান, কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। তবে দিল্লি পুলিশ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, আইন অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করেছে।

পরে ২৫ জুলাই ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং আন্দোলনকারীদের কয়েকটি মূল দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসের পর আন্দোলনের প্রথম পর্যায় স্থগিত করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষায় অনিয়ম ঠেকাতে সরকার পাবলিক এক্সামিনেশনস (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিনস) বিল সংসদে উত্থাপন করে।

বিরোধী দলের ওয়াকআউটের মধ্যেই গত ৩০ জুলাই রাজ্যসভায় বিলটি পাস হয়। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলো ২০ জুলাইয়ের ঘটনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ব্যাখ্যা এবং তার পদত্যাগের দাবি অব্যাহত রেখেছে।

সূত্র: দ্য হিন্দু