আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবিক সহায়তার কাজ করে চলা ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মানবাধিকারকর্মী রুহি লরেন আখতার এখন আছেন একটি ব্যতিক্রমী যাত্রায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি অংশ নিয়েছেন ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ নামে একটি আন্তর্জাতিক ত্রাণবাহী নৌবহরে।
রুহির সংস্থা ‘রিফিউজি বিরিয়ানি অ্যান্ড ব্যানানাস’ (আরবিবি) বহুদিন ধরে শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য খাদ্য ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে। গাজার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া এই মানবিক মিশন তারই এক সম্প্রসারণ।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে, রুহি আখতার ফ্লোটিলায় অবস্থান থেকে কথা বলছেন। জানিয়েছেন, “ভয় নয়, মানবতার বার্তাই সবচেয়ে জরুরি—আর সেটাই আমরা পৌঁছে দিতে চাই।”
বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নৌবহরের অন্তত ২৪টি জাহাজ এখনো গাজার দিকে যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। লাইভ ট্র্যাকার বলছে, এ পর্যন্ত কোনো ইসরায়েলি হস্তক্ষেপ ছাড়াই এগিয়ে যাচ্ছে এই ত্রাণবাহী বহর। এরই মধ্যে ‘মিকেনো’ নামের একটি জাহাজ গাজার জলসীমায় প্রবেশ করেছে বলেও জানা গেছে।
রুহি আখতারের জন্ম যুক্তরাজ্যের মরপেথে। পিতা কাপ্তান মিয়া একজন ব্রিটিশ বাংলাদেশি অভিবাসী। বর্তমানে রুহি নিউক্যাসলের এলসউইক ওয়ার্ডে বসবাস করছেন। একজন মানবিক সহায়তাকর্মী এবং অধিকারকর্মী হিসেবে তার ভূমিকা আন্তর্জাতিক পরিসরে ইতোমধ্যেই প্রশংসিত।
২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যের ‘নর্থ ইস্ট বাংলাদেশি অ্যাওয়ার্ডসে’ রুহিকে বছরের শ্রেষ্ঠ বাংলাদেশি ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
“আমি গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় অংশ নিয়েছি, কারণ অন্যায়ের সামনে চুপ করে থাকা কখনোই সমাধান নয়,” বলছিলেন রুহি।
“ফিলিস্তিনিরা বছরের পর বছর মৌলিক অধিকার—খাদ্য, পানি, নিরাপত্তা—সবকিছু থেকে বঞ্চিত। মানবিক সহায়তার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, কখনো একটা টুকরো রুটি কিংবা এক বোতল বিশুদ্ধ পানিই মানুষের জীবনে আশার আলো হয়ে উঠে। এই নৌবহর শুধু ত্রাণ নয়, বরং একটি বার্তা—বিশ্ব দেখছে, এবং গাজার মানুষের পাশে আমরা আছি।”
রুহি ও তার ১২ সদস্যের দল গত ১৮ সেপ্টেম্বর তিউনিসিয়ার গামার্থ বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেন। তারা যুক্ত হয়েছেন তিউনিসিয়া, স্পেন, গ্রিস ও ইতালি থেকে আসা আরও ৪০টির বেশি নৌযানের সঙ্গে। গাজার মানুষকে সহায়তা পাঠানোর পাশাপাশি ইসরায়েলি অবরোধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোও এই যাত্রার উদ্দেশ্য।
এর আগে তার সংস্থা গ্রিস, গাজা ও অন্যান্য সংঘাতময় এলাকায় জরুরি ত্রাণ বিতরণ করেছে।
তবে এই যাত্রা পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র মুখপাত্র সাইফ আবুকেশেক জানিয়েছেন, ভূমধ্যসাগরে গাজার কাছাকাছি অবস্থানে ইসরায়েলি বাহিনী অন্তত আটটি নৌযান থামিয়ে দিয়েছে। সেখানে ২০১ জন যাত্রী ছিলেন—যাদের মধ্যে ৩০ জন স্পেন, ২২ জন ইতালি, ২১ জন তুরস্ক ও ১২ জন মালয়েশিয়া থেকে এসেছেন। রয়টার্স জানায়, আটককৃত জাহাজের সংখ্যা ১৩টি পর্যন্ত হতে পারে।
এই বৈশ্বিক ফ্লোটিলায় অন্তত ৪৪টি দেশের ৫০০ জনের বেশি মানুষ রয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য, চিকিৎসক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিরা। সবাই একসঙ্গে একটি বার্তা দিচ্ছেন—মানবতা কোনো সীমান্ত মানে না।