সিলেটে ছিনতাইয়ের নতুন কৌশল নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ভয় ও আতঙ্ক। ছিনতাইকারীরা এখন ব্যবহার করছে রহস্যময় এক “ধুলো” বা ‘শয়তানের নিশ্বাস’, যা মুহূর্তেই মানুষকে মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণহীন করে ফেলে। ভুক্তভোগী টের পাওয়ার আগেই খোয়া যাচ্ছে টাকা, মোবাইল ফোন, এমনকি স্বর্ণালংকারও।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে এ পদার্থের নাম স্কোপোলামিন (Scopolamine)—যা সাধারণত বমি বা মাথা ঘোরা রোধে ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এখন অপরাধীরা এটিকে ছিনতাইয়ের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। আন্তর্জাতিকভাবে এটি পরিচিত ‘ডেভিলস ব্রেথ’ (Devil’s Breath) নামে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কোপোলামিন সরাসরি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে। আক্রান্ত ব্যক্তি সচেতন থাকলেও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। আশপাশে কী ঘটছে তা দেখতে ও শুনতে পেলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন না। এই সময়েই অপরাধীরা তার কাছ থেকে মূল্যবান জিনিস ছিনিয়ে নেয়।
সম্প্রতি সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি অটোরিকশা, বাস ও ট্রেনে এমন ঘটনার অভিযোগ বেড়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন ভুক্তভোগী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। কুমারগাঁও থেকে আম্বরখানা, বন্দরবাজার ও কদমতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে। বিশেষ করে রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি অটোরিকশাগুলোকে চক্রটির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের বাসিন্দা মারুফ আহমদ, সিলেট নগরীর কাজীটুলায় থাকেন। তিনি জানান, কুমারগাঁও থেকে আম্বরখানা যাওয়ার পথে সিএনজিতে উঠলে অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। আখালিয়া এলাকায় নেমে কিছুক্ষণ পর স্বাভাবিক হলে দেখেন—তার মোবাইল ফোন উধাও।
একইভাবে, বন্দরবাজারের কর্মজীবী জুবায়ের আহমদ রিংকুও ট্রেনে ঢাকা যাওয়ার পথে একই অভিজ্ঞতার শিকার হন। শ্রীমঙ্গল অতিক্রমের সময় হঠাৎ অচেতনতার মতো অনুভব করেন, পরে স্বাভাবিক হয়ে দেখেন—তার ফোন ও টাকা নেই।
এছাড়া কানাডা প্রবাসী জালাল আহমদ, পাঠানটুলা থেকে বন্দরবাজার যাওয়ার পথে একই কৌশলে প্রতারিত হন। তার ধারণা, চালক ও অন্যান্য যাত্রী সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য।
বিষয়টি নিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন,
“এমন একাধিক অভিযোগ আমরা পেয়েছি। পুলিশ বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করছে এবং তথ্যপ্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে চক্রটিকে ধরতে কাজ চলছে।”
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, স্কোপোলামিন সাধারণত সূক্ষ্ম গুঁড়া আকারে ছড়ানো হয়—যা বাতাসে ফুঁ দিয়ে, কাপড়ে লাগিয়ে বা কাগজে মেখে ছড়ানো সম্ভব। এটি চোখে দেখা যায় না, গন্ধও নেই। আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝে ওঠার আগেই পদার্থটি শ্বাসনালীর মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে।
তাদের পরামর্শ, অচেনা কেউ কিছু ধরতে বললে সতর্ক থাকতে হবে। যানবাহনে উঠার আগে রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেখে উঠা নিরাপদ। কারও আচরণ সন্দেহজনক মনে হলে সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে পড়তে হবে। পাশাপাশি, মাস্ক ব্যবহার করলে কিছুটা সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব, কারণ পদার্থটি মূলত নাক ও মুখ দিয়েই শরীরে প্রবেশ করে।