যুক্তরাজ্যে অভিবাসনের নিয়ম আরও কড়াকড়ি হচ্ছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যারা ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি থেকে দেশটিতে স্কিল্ড ওয়ার্কার, স্কেল-আপ বা হাই পটেনশিয়াল ইন্ডিভিজুয়াল (HPI) ভিসায় আবেদন করবেন, তাদের এখন থেকে এ-লেভেল সমমানের ইংরেজি দক্ষতা দেখাতে হবে।
১৪ অক্টোবর সংসদে উপস্থাপিত নতুন আইনে বলা হয়েছে— যারা যুক্তরাজ্যে অভিবাসন বা নির্দিষ্ট ভিসা ক্যাটাগরিতে আবেদন করবেন, তাদের এখন থেকে ইংরেজি ভাষায় কথা বলা, শোনা, পড়া ও লেখা—এই চার দক্ষতায় ‘এ-লেভেল’ সমমানের মান অর্জন করতে হবে।
সরকার বলছে, এই পরিবর্তন যুক্তরাজ্যে অভিবাসন সংখ্যা কমানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ, যা চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত হোয়াইট পেপার-এ তুলে ধরা হয়েছিল।
সরকার আরও বলছে, পুরনো ‘ব্যর্থ’ অভিবাসন ব্যবস্থার পরিবর্তে এখন তারা এমন একটি নিয়ন্ত্রিত, বাছাইকৃত ও ন্যায্য নীতি চালু করছে, যেখানে দক্ষতা ও দায়িত্ববোধকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।
গৃহমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেছেন, “আপনি যদি এই দেশে আসেন, তাহলে আমাদের ভাষা শিখতে হবে এবং সমাজে নিজের ভূমিকা রাখতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “এই দেশ সবসময়ই স্বাগত জানিয়েছে সেইসব মানুষকে, যারা এখানে এসে অবদান রাখে। কিন্তু কেউ যদি ভাষা না শিখে, সমাজে অংশ না নেয়— সেটা গ্রহণযোগ্য নয়।”
নতুন নিয়মে আবেদনকারীদের কথা বলা, শোনা, পড়া ও লেখা—এই চার দক্ষতায় সরাসরি পরীক্ষা দিতে হবে, যা পরিচালনা করবে হোম অফিস অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলাফল যাচাই করা হবে ভিসা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে।
এখন পর্যন্ত যেখানে বি১ (GCSE সমমান) পর্যায়ের ইংরেজি যথেষ্ট ছিল, সেখানে নতুন নিয়মে আবেদনকারীদের বি২ লেভেল পাস করতে হবে— যা আরও উন্নত স্তর, এ-লেভেলের সমান।
কারা পড়বে এই নিয়মের আওতায়
‘স্কিল্ড ওয়ার্কার’ ভিসায় যুক্তরাজ্যে আসতে চাইলে আবেদনকারীকে সরকার অনুমোদিত কোনো নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করতে হবে এবং বছরে কমপক্ষে £৪১,৭০০ বেতন পেতে হবে, বা তার পেশার “গোয়িং রেট” অনুযায়ী— যেটি বেশি।
‘স্কেল-আপ’ ভিসা দেওয়া হবে দ্রুত বেড়ে ওঠা ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোতে কাজের সুযোগ পাওয়া বিদেশিদের। আর ‘HPI’ ভিসা পাবেন তারা, যারা গত পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্বের সেরা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়েছেন।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের ভাষায়, বি২ লেভেল অর্জনকারীরা “জটিল লেখা বা আলোচনা সহজে বুঝতে পারে, সাবলীলভাবে কথা বলতে পারে এবং বিস্তারিতভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারে।”
আরও পরিবর্তন আসছে
হোম অফিসের মন্ত্রী মাইক ট্যাপ জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে আরও ভিসা ক্যাটাগরি ও পারিবারিক নির্ভরশীলদের জন্য ইংরেজি ভাষা সংক্রান্ত শর্ত যোগ করা হবে।
সরকারের হিসাবে, এসব পরিবর্তন কার্যকর হলে প্রতি বছর যুক্তরাজ্যে আসা মানুষের সংখ্যা এক লাখ পর্যন্ত কমতে পারে।
২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যে নেট মাইগ্রেশন কমে দাঁড়িয়েছে ৪৩১,০০০, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক— ২০২৩ সালে এই সংখ্যা রেকর্ড ৯০৬,০০০ ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেশন অবজারভেটরির পরিচালক ড. ম্যাডেলিন সাম্পশন বলছেন, “সরকার এখন এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার চাপে আছে— একদিকে ভালো ইংরেজি জানা অভিবাসী চাইছে, অন্যদিকে এমন কর্মীও চাইছে যারা অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।”
তার মতে, অনেক গ্র্যাজুয়েট পেশাতেই ইতিমধ্যে এ-লেভেলের চেয়ে বেশি ইংরেজি দক্ষতা দরকার হয়। তবে নতুন নিয়মের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে মাঝারি দক্ষতার কাজগুলোতে, যেখানে ভাষা জ্ঞানের এত উচ্চ মান সাধারণত চাওয়া হয় না।
অভিবাসন আইনজীবী আফসানা আখতার বিবিসি নিউজকে বলেন, নিয়মটি অনেকের জন্য “অন্যায্য”, কারণ “যুক্তরাজ্যের অনেক মানুষই হয়তো ইংরেজি এ-লেভেল পরীক্ষায় পাস করতে পারবে না।”
তিনি বলেন, “এভাবে নিয়ম করলে অনেক দক্ষ কর্মী বাদ পড়বে, যারা আসলে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে চান। GCSE মানের ইংরেজিই যথেষ্ট— মানুষ এখানে এসে সমাজে মিশলে তাদের ইংরেজি দক্ষতা নিজে থেকেই বাড়বে।”
শিক্ষার্থী ও দক্ষ কর্মীদের জন্য নতুন শর্ত
সরকারের হোয়াইট পেপারে আরও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
- আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষে চাকরি খোঁজার সময়সীমা দুই বছর থেকে কমিয়ে ১৮ মাস করা হচ্ছে— কার্যকর হবে জানুয়ারি ২০২৭ থেকে।
- শিক্ষার্থীদের আর্থিক প্রমাণের শর্তও বাড়ানো হয়েছে— এখন লন্ডনের বাইরে মাসে কমপক্ষে £১,১৭১ (আগে ছিল £১,১৩৬) দেখাতে হবে, সর্বোচ্চ নয় মাসের জন্য।
- গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসা-এর আওতা বাড়ানো হয়েছে, যাতে প্রযুক্তি, শিল্প ও একাডেমিক খাতে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারপ্রাপ্তরাও এখন আবেদন করতে পারবেন।
এছাড়া, ইমিগ্রেশন স্কিলস চার্জ (ISC) বাড়ানো হয়েছে—
- ছোট প্রতিষ্ঠান বা দাতব্য সংস্থার জন্য বছরে প্রতি কর্মীর ক্ষেত্রে £৪৮০,
- আর মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য £১,৩২০।
আগে এই হার ছিল যথাক্রমে £৩৬৪ ও £১,০০০।
সরকার বলছে, দেশের প্রতিভা ধরে রাখতে এবং আরও দক্ষ বিদেশি কর্মী আনতে HPI ভিসা রুট প্রসারিত করা হচ্ছে। এই রুটে আবেদনকারীর সংখ্যা ২,০০০ থেকে বাড়িয়ে ৪,০০০ করা হবে, তবে বছরে সর্বোচ্চ ৮,০০০ আবেদন গ্রহণ করা হবে।