১৭ বছর পর স্বদেশে তারেক রহমান, জনসমুদ্রে ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন

ইতিহাস সৃষ্টি করে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে ঢাকায় অবতরণের মধ্য দিয়ে তাঁর বহু প্রতীক্ষিত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাস্তব রূপ নেয়। দেশে ফিরেই খোলা পায়ে মাতৃভূমির মাটিতে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে একমুঠো মাটি হাতে তুলে নেন তিনি।

বাংলাদেশ বিমানের বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি শেষে ঢাকায় পৌঁছান তারেক রহমান। সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন তাঁর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমান। বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে দলের শীর্ষ নেতাদের ফুলেল শুভেচ্ছা ও উষ্ণ অভ্যর্থনায় সিক্ত হন তিনি।

ঢাকায় নেমেই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ভিআইপি গেট দিয়ে বের হয়ে বিমানবন্দরের সামনের বাগানে জুতা-মোজা খুলে কিছুক্ষণ খালি পায়ে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং মাতৃভূমির মাটি হাতে তুলে নেন। আবেগঘন এই দৃশ্য উপস্থিত সবাইকে আপ্লুত করে।

এরপর তিনি পূর্বাচলের ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ের (৩০০ ফিট সড়ক) গণসংবর্ধনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হন। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা লাল-সবুজ রঙের বাসে চড়ে পথে পথে হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা গ্রহণ করেন তিনি। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে ১৫–২৫ মিনিট লাগে, সেখানে লাখো মানুষের ভিড়ের কারণে সংবর্ধনাস্থলে পৌঁছাতে তাঁর গাড়িবহরের সময় লাগে প্রায় চার ঘণ্টা।

সংবর্ধনাস্থলে পৌঁছে বাস থেকে নেমে হেঁটেই মঞ্চে ওঠেন তারেক রহমান। মঞ্চের তিন দিক ঘুরে হাত নেড়ে জনসমুদ্রের অভিবাদন গ্রহণ করেন তিনি। মুহুর্মুহু স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তারেক রহমান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশের মাটিতে ফিরে আসতে পারা তাঁর জীবনের এক আবেগঘন মুহূর্ত। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আবার কথা বলার অধিকার ফিরে পেতে চায় এবং এখন সময় এসেছে সবাই মিলে দেশ গড়ার।

তিনি একটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন তুলে ধরে বলেন, পাহাড়-সমতল, নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণ, সংখ্যালঘু—সবাইকে নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি গণতান্ত্রিক ও শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

স্বৈরাচারী শাসনামলে গুম-খুন ও নিপীড়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে যেকোনো উসকানি এড়িয়ে চলার অনুরোধ করেন।

মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’-এর প্রসঙ্গ টেনে তিনি ঘোষণা করেন, “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান—দেশের মানুষের জন্য, দেশের ভবিষ্যতের জন্য।” এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি দেশের প্রতিটি মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।

বক্তব্য শেষে তিনি অসুস্থ মা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া চান এবং সংবর্ধনা শেষে এভারকেয়ার হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান।

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে পূর্বাচলের ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে সকাল থেকেই জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে বিএনপির রাজনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টি হয়েছে।