আহমাদুল কবির | মালয়েশিয়া:
মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে ইমিগ্রেশন বিভাগের পৃথক দুটি অভিযানে বাংলাদেশিসহ মোট ১৫০ জন অবৈধ অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে। বুধবার ভোররাতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এসব অভিযানে নগরীর চৌকিট ও জালান ক্লাং লামা এলাকায় অবৈধ বসবাস ও কর্মসংস্থানের চিত্র উঠে এসেছে।
চৌকিটে পুরোনো অ্যাপার্টমেন্টে অভিযান
ইমিগ্রেশন সূত্র জানায়, রাজধানীর চৌকিট এলাকায় একটি পুরোনো অ্যাপার্টমেন্টে অভিযান চালিয়ে ৭৯ জন অবৈধ অভিবাসীকে আটক করা হয়। আটককৃতদের মধ্যে ২৩ জন নারী রয়েছেন। ইমিগ্রেশনের উপ-মহাপরিচালক (অপারেশন) দাতুক লোকমান এফেন্দি রামলি জানান, বুধবার রাত ১২টা ৩০ মিনিটে শুরু হওয়া এই অভিযানটি গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ অভিবাসীদের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত ছিল।
আটককৃতদের বয়স ১৭ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে। তাদের বিরুদ্ধে বৈধ পাসপোর্ট ও কাজের পারমিট না থাকা এবং নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থানের অভিযোগ আনা হয়েছে। আটকদের মধ্যে ৩৯ জন ইন্দোনেশিয়া, ২৫ জন বাংলাদেশ, ১০ জন নেপাল, দুইজন ভারত, দুইজন পাকিস্তান এবং একজন মিয়ানমারের নাগরিক।
ইমিগ্রেশন বিভাগ জানায়, অধিকাংশ আটক ব্যক্তি নিরাপত্তারক্ষী ও নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। তারা অতিরিক্ত ভিড় ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করছিলেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
অভিযানের সময় কয়েকজন বিদেশি নাগরিক সিঙ্কের নিচে, পুরোনো জিনিসপত্রের স্তূপে এবং পানির ট্যাংকের ফাঁকে লুকানোর চেষ্টা করেন। আটক এক ইন্দোনেশীয় নাগরিক জানান, পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি ভয়ে আত্মগোপনে ছিলেন।
জালান ক্লাং লামায় অবৈধ কলোনিতে হানা
অন্যদিকে, জাল বৈদ্যুতিক ও পানির সংযোগ ব্যবহার করে গড়ে ওঠা একটি অবৈধ অভিবাসী কলোনিতে অভিযান চালিয়ে আরও ৭১ জনকে আটক করেছে কুয়ালালামপুর ইমিগ্রেশন বিভাগ (জেআইএম)। বুধবার ভোরে জালান ক্লাং লামা এলাকায় নিউ পান্তাই এক্সপ্রেসওয়ে (এনপিই)-এর পাশে অবস্থিত এই কলোনিতে অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে দেখা যায়, সেখানে অবৈধভাবে নির্মিত কক্ষ, টয়লেট, রান্নাঘর, বসার ঘর ও একটি নামাজঘর রয়েছে। সংকীর্ণ গলিপথে বিভক্ত এসব স্থাপনায় একাধিক বিদেশি নাগরিক বসবাস করছিলেন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ ব্যবহার করে শহরের মাঝখানে কীভাবে এমন একটি বসতি টিকে ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কলোনির এক বাসিন্দা, ৩০-এর কোঠায় এক ইন্দোনেশীয় নাগরিক জানান, তিনি প্রায় এক বছর ধরে সেখানে বসবাস করছেন এবং ‘বাড়িওয়ালা’ পরিচয়ধারী এক ইন্দোনেশীয় নাগরিককে মাসিক ৩৫০ রিঙ্গিত ভাড়া দিতেন।
অভিযানের সময় কেউ ছাদ বেয়ে পালানোর চেষ্টা করেন, কেউ ছোট জায়গা, দরজার পেছনে কিংবা টয়লেটে লুকিয়ে পড়েন, আবার কেউ ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন।
দাতুক লোকমান এফেন্দি রামলি জানান, এক সপ্তাহের গোয়েন্দা নজরদারির পর ভোর ২টা ৩০ মিনিটে এই অভিযান শুরু হয়। এতে ৩৪ জন নারী ও ৩৭ জন পুরুষসহ মোট ৭১ জন সন্দেহভাজন অবৈধ অভিবাসী আটক হন। আটককৃতদের মধ্যে ৬৬ জন ইন্দোনেশিয়া, তিনজন মিয়ানমার, একজন ভারত এবং একজন পাকিস্তানের নাগরিক।
আইনগত ব্যবস্থা ও সতর্কবার্তা
আটক সবাইকে পরবর্তী তদন্তের জন্য ইমিগ্রেশন ডিপোতে নেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন আইন ১৯৫৯/৬৩-এর ৬(১)(সি) ও ১৫(১)(সি) ধারায় মামলা ও তদন্ত চলছে।
দাতুক লোকমান এফেন্দি রামলি জোর দিয়ে বলেন, অবৈধ অভিবাসী ও তাদের আশ্রয়দাতা নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘৩৬০ ডিগ্রি’ কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।