ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে চান ট্রাম্প, তেহরান বলছে ঠিক করবে যুদ্ধের সময়সীমা

ইরানের শাসনব্যবস্থাকে উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে দেশটিতে হামলা চালায়। প্রথম হামলাতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে দ্রুত সফলতা পাওয়ায় আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে এবং প্রয়োজন হলে আরও দীর্ঘ সময় অভিযান চালানো হবে।

তবে ইরান পাল্টা হামলা শুরু করলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায় তেহরান। এতে মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ইসরাইলেও ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। যদিও ইরান জানিয়েছে, যুদ্ধ কখন শেষ হবে তা নির্ধারণ করবে তেহরানই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায়ও আগ্রহ নেই বলে জানিয়েছে দেশটি। খবর আলজাজিরা ও বিবিসির।

মঙ্গলবার যুদ্ধের একাদশ দিনে উভয় পক্ষই হামলা অব্যাহত রাখে। ইরান ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন স্বার্থে হামলা চালায়। অন্যদিকে ইসরাইল ইরানের রাজধানী তেহরান ও অন্যান্য এলাকায় বিমান হামলা চালায়। একই সঙ্গে লেবাননের পরিস্থিতিও দিন দিন আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।

রিপাবলিকান দলের এক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ একটি ছোট অভিযান। তিনি দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী ইতোমধ্যে ইরানের প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংস করেছে এবং ৪৬টি নৌবাহিনীর জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানকে লক্ষ্য করে আগাম হামলা না চালালে দেশটি এক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর হামলা চালাত। তবে তিনি স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে জয়ী হলেও সেই জয় এখনও যথেষ্ট নয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না ইরান। দেশটির নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি বলেছেন, ফাঁকা হুমকিতে ইরান ভয় পায় না। আপনার চেয়েও শক্তিশালী নেতারা ইরানকে নির্মূল করতে পারেনি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসার সম্ভাবনা এখন নেই। তার ভাষায়, আলোচনার মাঝখানে বারবার হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সম্ভাবনা নষ্ট করেছে। তিনি বলেন, এই যুদ্ধ ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং দেশটি কেবল আত্মরক্ষার জন্য লড়াই করছে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুদ্ধ কখন শেষ হবে তা ওয়াশিংটন নয়, তেহরানই নির্ধারণ করবে। বাহিনীটির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নায়েনি বলেছেন, যুদ্ধের শুরু থেকে এখন আরও বেশি সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে ইরান।

এদিকে ইসরাইল জানিয়েছে, তারা ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বিবিসিকে বলেছেন, সাম্প্রতিক হামলাগুলো আগের তুলনায় আরও তীব্র ছিল এবং আকাশে বিস্ফোরণের অদ্ভুত সাদা আলো দেখা গেছে।

ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ জানিয়েছে, দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় শহর খোমেইনের একটি স্কুলে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, এতে আশপাশের কয়েকটি ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পাঁচটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। কুয়েতও ছয়টি ড্রোন ধ্বংস করার দাবি করেছে।

বাহরাইনের রাজধানী মানামায় হামলায় এক নারী নিহত হয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে আসা মিসাইল ও ড্রোন প্রতিরোধে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে।

এদিকে লেবাননেও উত্তেজনা বাড়ছে। বৈরুত ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বোমাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইল বলছে, তারা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে এসব হামলা চালাচ্ছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৪৮৬ জন নিহত হয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দীর্ঘমেয়াদে একই অবস্থানে নাও থাকতে পারে। লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ কমতে থাকবে। তার মতে, এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এরই মধ্যে মঙ্গলবার রাতে আবারও ইসরাইলকে লক্ষ্য করে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। এতে তেলআবিব ও আশপাশের এলাকায় সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে।