যুক্তরাজ্যের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী এবং আলোচিত ব্যক্তিত্ব হলেন অ্যাঞ্জেলা রেনার। লেবার পার্টির এই শীর্ষস্থানীয় নেত্রী শ্রমজীবী পরিবার থেকে থেকে উঠে এসে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদ—ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী—পর্যন্ত আসীন হয়েছিলেন তিনি।
অ্যাঞ্জেলা রেনার ১৯৮০ সালের ২৮ মার্চ গ্রেটার ম্যানচেস্টারের স্টকপোর্টে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রাথমিক জীবন ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল এবং চ্যালেঞ্জিং।
তিনি একটি দরিদ্র পরিবারে বড় হন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে গর্ভবতী হওয়ায় কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই তিনি স্কুল ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
পরবর্তীতে তিনি স্থানীয় কাউন্সিলে একজন সামাজিক যত্ন কর্মী (Care Worker) হিসেবে কাজ শুরু করেন। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের অধিকার আদায়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি ব্রিটেনের অন্যতম বৃহৎ ট্রেড ইউনিয়ন ‘ইউনিসন’ (UNISON)-এর সাথে যুক্ত হন এবং দ্রুত উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের ইউনিয়ন প্রধান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি ম্যানচেস্টারের অ্যাশটন-আন্ডার-লাইন আসন থেকে লেবার পার্টির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
সংসদে যোগ দেওয়ার পর অত্যন্ত দ্রুত গতিতে রেনারের রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। জেরেমি করবিনের নেতৃত্বাধীন শ্যাডো ক্যাবিনেটে তিনি শ্যাডো শিক্ষা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২০ সালে জেরেমি করবিনের পদত্যাগের পর, স্যার কিয়ার স্টারমার লেবার পার্টির নতুন নেতা নির্বাচিত হন। একই সময়ে দলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে লেবার পার্টির ডেপুটি লিডার নির্বাচিত হন অ্যাঞ্জেলা রেনার।
রেনার নিজেকে একজন “বামপন্থী সমাজতান্ত্রিক” হিসেবে বর্ণনা করেন। দলের ভেতরে তিনি ঐতিহ্যগত শ্রমিক শ্রেণী এবং বামপন্থী ধারার প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত ছিলেন, যা সেন্ট্রিস্ট (মধ্যপন্থী) নেতা কিয়ার স্টারমারের সাথে দলের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টি বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার তার ক্যাবিনেটে অ্যাঞ্জেলা রেনারকে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেন: ১. যুক্তরাজ্যের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ও ২. গৃহায়ণ, সম্প্রদায় ও স্থানীয় সরকার বিষয়ক মন্ত্রী।
মন্ত্রী হিসেবে তিনি যুক্তরাজ্যের আবাসন সংকট দূর করতে এবং সাশ্রয়ী মূল্যের বাড়ি নির্মাণে বড় ধরনের পরিকল্পনা হাতে নেন।
‘নিউ ডিল ফর ওয়ার্কিং পিপল’ নীতিমালার মাধ্যমে শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তা ও অধিকার জোরদার করার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
২০২৪ সালে সরকার গঠনের পর থেকে প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় তিনি সফলভাবে ডেপুটি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ক্যাবিনেটে একটি বড় রদবদল এবং রাজনৈতিক কৌশলগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে তিনি ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী এবং লেবার পার্টির ডেপুটি লিডারের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
বর্তমানে তিনি ক্যাবিনেটের বাইরে থেকে একজন ব্যাকবেঞ্চ এমপি হিসেবে তার নির্বাচনী এলাকা অ্যাশটন-আন্ডার-লাইনের প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং ব্রিটিশ রাজনীতিতে একজন প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন।
অ্যাঞ্জেলা রেনারের জীবন এক অনন্য অনুপ্রেরণার গল্প। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা ছাড়া কেবল নিজের যোগ্যতা, বাগ্মিতা এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলে তিনি ডাউনিং স্ট্রিটের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
