২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে রায় দিয়েছিল যুক্তরাজ্যের ৫১.৯ শতাংশ ভোটার। সেই সিদ্ধান্তই বিশ্বজুড়ে “ব্রেক্সিট” নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও আলোচনার পর ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করে যুক্তরাজ্য।
ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে—ব্রেক্সিট কি সত্যিই যুক্তরাজ্যের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল?
অর্থনীতি, রাজনীতি, শ্রমবাজার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতিবিদ ও জনমত জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রেক্সিট নিয়ে ব্রিটিশ সমাজে বিভক্তি এখনো গভীর।
অর্থনীতিতে ধাক্কা, কমেছে প্রবৃদ্ধির গতি
ব্রেক্সিটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে। বিভিন্ন স্বাধীন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের ফলে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে শ্লথ হয়েছে।
London School of Economics-এর সেন্টার ফর ইকোনমিক পারফরম্যান্স (CEP) এবং National Institute of Economic and Social Research-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদে ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যের GDP প্রায় ২ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যে নতুন কাস্টমস প্রক্রিয়া, কাগজপত্রের জটিলতা এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলো বড় চাপের মুখে পড়েছে।
British Chambers of Commerce-এর জরিপে অনেক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় বাজারে পণ্য রপ্তানি আগের তুলনায় কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। ইইউ-এর সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (UK-EU Trade and Cooperation Agreement) থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কাস্টমস চেকিং এবং কাগজপত্রের ঝামেলার কারণে যুক্তরাজ্যের ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এছাড়া, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) অনেক কমে গেছে, কারণ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় একক বাজারে প্রবেশের সহজ পথ হিসেবে দেখতে পারছে না।
বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়
খাদ্য আমদানিতে নতুন বাধা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে। লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স (LSE)-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ইইউ থেকে খাদ্য আমদানির ওপর নতুন শুল্ক ও অ-শুল্ক বাধা আরোপের ফলে সাধারণ ব্রিটিশ পরিবারগুলোর খাদ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষ করে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়ে বহু পরিবারকে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্রেক্সিট-পরবর্তী সরবরাহ সংকট এবং শ্রমবাজারের চাপ মূল্যস্ফীতিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
শ্রমিক সংকট ও অভিবাসনের নতুন বাস্তবতা
ব্রেক্সিট সমর্থকদের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং অভিবাসন কমানো। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি হয়েছে আরও জটিল।
ইইউ নাগরিকদের অবাধ যাতায়াত বন্ধ হওয়ার পর যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন খাতে তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে National Health Service (NHS), কৃষি, আতিথেয়তা ও পরিবহন খাত বড় ধরনের কর্মী সংকটে পড়ে।
তবে ইইউ থেকে অভিবাসন কমলেও, ব্রেক্সিট-পরবর্তী নতুন পয়েন্ট-ভিত্তিক ভিসা নীতির কারণে অ-ইইউ দেশগুলো (যেমন: ভারত, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া) থেকে অভিবাসন রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে, নেট অভিবাসন কমানোর যে রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল, তা পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ চাপ
ব্রেক্সিট শুধু অর্থনীতিকেই নয়, যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোকেও নাড়িয়ে দিয়েছে।
উত্তর আয়ারল্যান্ডে সীমান্ত ও বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। বাইরে থাকার কারণে বৈশ্বিক কূটনীতি ও বাণিজ্যে যুক্তরাজ্যের দরকষাকষির ক্ষমতা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
ব্রেক্সিট সমর্থকদের যুক্তিও এখনো শক্তিশালী
তবে ব্রেক্সিটকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলতেও নারাজ অনেকে।
সমর্থকদের মতে, ব্রেক্সিটের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য তার আইন ও নীতিনির্ধারণের পূর্ণ স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। এখন UK Parliament নিজস্বভাবে আইন প্রণয়ন করতে পারছে এবং ইউরোপীয় আদালতের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত রয়েছে।
এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্বাধীন বাণিজ্য চুক্তি এবং CPTPP জোটে যোগদানকে ব্রেক্সিটের বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় দ্রুত ভ্যাকসিন অনুমোদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকেও ব্রেক্সিট সমর্থকরা একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
জনমত এখন কী বলছে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে YouGov পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকের বেশি ব্রিটিশ নাগরিক (প্রায় ৫৫% – ৫৮%) এখন মনে করেন ব্রেক্সিট ছিল একটি ভুল সিদ্ধান্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জিত হলেও এর বিনিময়ে যুক্তরাজ্যকে যে অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।
চূড়ান্ত মূল্যায়ন এখনো সময়ের হাতে। তবে এটা বলা যায় যে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকের নিরিখে ব্রেক্সিট এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের জন্য একটি ব্যয়বহুল এবং ক্ষতিকারক সিদ্ধান্ত প্রমাণিত হয়েছে। নিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জিত হলেও, তার বিনিময়ে যুক্তরাজ্যকে যে অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির বৈশ্বিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে। তবে এটি সম্পূর্ণ ‘ভুল’ ছিল কিনা, তা হয়তো আগামী কয়েক দশকে বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য নীতি, যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—এবং যুক্তরাজ্যের নিজস্ব নীতি নির্ধারণের দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে।
এমএইচএম/২১/৫/২০২৬
