মসজিদ—এটি শুধু একটি ইবাদতের স্থান নয়, বরং মুসলমানদের আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর স্মরণ এবং সমাজিক ঐক্যের অন্যতম প্রতীক। মহান আল্লাহ তাআলা মসজিদকে নিজের ঘর বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি এটিকে সবচেয়ে সম্মানিত স্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং এ ঘরে বসবাসকারী মানুষদেরকে বিশেষ গুণাবলি দ্বারা ভূষিত করেছেন।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহ এমন কিছু ঘরের অনুমতি দিয়েছেন, যেগুলোর মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং সেগুলোতে তাঁর নাম স্মরণ করা হবে। সেখানে সকাল-সন্ধ্যায় তাঁকে মহিমান্বিত করে এমন লোকেরা রয়েছেন—যাদেরকে ব্যবসা ও বেচাকেনা আল্লাহর স্মরণ, নামাজ কায়েম ও যাকাত দেওয়া থেকে গাফেল করে না। তারা ভয় করে এমন এক দিনকে, যেদিন অন্তর ও চোখ উলট-পালট হয়ে যাবে।” (সূরা নূর, আয়াত ৩৬-৩৭)
এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায়, মসজিদ কেবল নামাজ আদায়ের জন্য নয়, বরং একান্তভাবে আল্লাহর ইবাদত, তাঁর স্মরণ এবং আখিরাতের চিন্তায় রত থাকার স্থান। ইসলামের ইতিহাসে মসজিদ সব সময় একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ নিজেও মসজিদে নববীকে ইসলামের প্রথম সাংগঠনিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে ইবাদত, শিক্ষা, বিচার-বিভাগ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নানা কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
রাসুলুল্লাহ ﷺ মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। একবারের ঘটনা—সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমরা একদিন রাসুল ﷺ-এর সঙ্গে মসজিদে নববীতে বসা ছিলাম। হঠাৎ এক বেদুঈন এসে মসজিদের ভিতরে প্রস্রাব করতে লাগল। সাহাবিরা চমকে উঠে তাকে বাধা দিতে গেলেন। তখন রাসুল ﷺ বললেন, “তোমরা তাকে বাধা দিও না, বরং তাকে ছেড়ে দাও।” পরে লোকটি প্রস্রাব শেষ করলে, রাসুল ﷺ তাকে ডেকে বললেন, “এটা হলো মসজিদ। এখানে প্রস্রাব করা, ময়লা-আবর্জনা ফেলা যায় না। বরং এটি আল্লাহর জিকির, সালাত ও কোরআন তিলাওয়াতের স্থান।” এরপর তিনি উপস্থিত সাহাবিদের মধ্য থেকে একজনকে নির্দেশ দেন, যেন সে এক বালতি পানি এনে ওই স্থানটি পরিষ্কার করে। (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৫৪৮)
এ ঘটনা প্রমাণ করে, মসজিদের পবিত্রতা এবং ব্যবহারবিধি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, আর রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে কীভাবে মসজিদের আদব শিক্ষা দিতেন।
মসজিদের মর্যাদা রক্ষায় ইসলাম কিছু বিশেষ নিয়ম ও নিষেধাজ্ঞা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে প্রথমেই উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, মসজিদে হারানো জিনিস খুঁজে মাইকে ঘোষণা দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অনেক সময় দেখা যায়, কেউ মসজিদে কোনো বস্তু হারিয়ে গেলে ইমাম সাহেবকে মাইক ব্যবহারের অনুরোধ করেন, এমনকি চাপও প্রয়োগ করেন। অথচ রাসুলুল্লাহ ﷺ এ বিষয়ে বলেছেন, “যে ব্যক্তি মসজিদে তার হারানো জিনিস খুঁজে ডাকাডাকি করে, তোমরা বলো: ‘আল্লাহ যেন তা তোমার কাছে ফিরিয়ে না দেন।’” (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৩) কেননা, মসজিদ এই উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়নি। তবে কারো কাছে নিচুস্বরে জানতে চাওয়া বা ইমাম সাহেবকে ব্যক্তিগতভাবে জানানো নিষিদ্ধ নয়।
একইভাবে, মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় করাও ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যদি মসজিদে কাউকে বেচাকেনা করতে দেখো, তবে বলো: ‘আল্লাহ যেন তোমার ব্যবসায়ে বরকত না দেন।’” (তিরমিজি, হাদিস: ১৩২১) অর্থাৎ, মসজিদকে বানিজ্যকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
মসজিদে কাব্য আবৃত্তি করে প্রতিযোগিতা করা কিংবা অপ্রাসঙ্গিক সাহিত্যচর্চা করাও ইসলামী আদববিরোধী। রাসুলুল্লাহ ﷺ মসজিদে কবিতা পাঠ করতে নিষেধ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ মসজিদে কবিতা আবৃত্তি করতে নিষেধ করেছেন (নাসায়ি, হাদিস: ৭১৫)। তবে যেসব কবিতা ইসলামের প্রশংসা করে, ঈমান বৃদ্ধি করে, তা অনুমোদিত হয়েছে।
মসজিদে উচ্চস্বরে দুনিয়াবি আলোচনা করাও একান্তভাবে নিষিদ্ধ। একবার উমর (রাঃ) মসজিদে দু’জনকে উচ্চস্বরে কথা বলার কারণে শাসন করেছিলেন। (বুখারি, হাদিস: ৪৭০) মসজিদের ভেতরে এমন আচরণ অন্যদের ইবাদতে বিঘ্ন ঘটাতে পারে এবং পরিবেশ নষ্ট করে। ঠিক তেমনি, কোরআন তিলাওয়াত বা নামাজে কিরাত পাঠ করার সময় এত উচ্চস্বরে পড়া নিষেধ, যাতে অন্য মুসল্লির মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রাসুল ﷺ এ বিষয়ে বলেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই স্বীয় রবের সঙ্গে চুপিসারে আলাপে রত। কাজেই তোমরা পরস্পরকে কষ্ট দিও না এবং পরস্পরের সামনে আওয়াজ উঁচু করো না।” (আবু দাউদ, হাদিস: ১৩৩২)
সব মিলিয়ে বলা যায়, মসজিদ হলো এমন এক পবিত্র স্থান, যেখানে শুধুই আল্লাহর ইবাদত, নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির করা যায়। উদ্দেশ্যহীন কথাবার্তা, ক্রয়-বিক্রয়, হারানো জিনিস খোঁজার ঘোষণা, অপ্রয়োজনীয় কবিতা আবৃত্তি বা হৈচৈ করা—এসব মসজিদের পবিত্রতাকে বিনষ্ট করে। ইসলামের দৃষ্টিতে এসব কাজ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
মসজিদে প্রবেশের সময় প্রতিটি মুসলমানের উচিত—পবিত্র দেহ ও মন নিয়ে প্রবেশ করা, আদব বজায় রাখা, পরিপাটি পোশাক পরিধান করা, মোবাইল ফোন নীরব রাখা এবং ইবাদতে মনোনিবেশ করা। এতে মসজিদের মর্যাদা রক্ষা হবে এবং আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মসজিদের মর্যাদা বোঝার এবং এর আদবসমূহ মেনে চলার তাওফিক দিন। আমিন।