সপ্তাহের অন্য দিনগুলোর চেয়ে শুক্রবার, অর্থাৎ জুমার দিনের এক আলাদা গুরুত্ব রয়েছে ইসলামে। এ দিনটি শুধু একটি সাপ্তাহিক ঈদের মতোই নয়, বরং ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা আর দোয়া কবুলের প্রতিশ্রুতির এক অনন্য দিন। সব দিনের মধ্যে জুমাবারকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। কোরআন ও হাদিসে এ দিনের বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার কথা বলা হয়েছে।
জুমার দিন কেন শ্রেষ্ঠ?
হাদিসে এসেছে, হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছিল জুমার দিনেই। এই দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় প্রেরণ করা হয়, আবার এই দিনেই তাঁর ইন্তেকালও হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যেখানে বান্দা আল্লাহর কাছে যা কিছুই চাইবে—যদি তা হারাম না হয়—তিনি তা কবুল করবেন।” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৮৯৫)
ইহুদি-খ্রিস্টানরা জানত না জুমার মাহাত্ম্য
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, পূর্ববর্তী ধর্মের অনুসারীরা এই দিনের গুরুত্ব জানত না। ইহুদিরা শনিবার এবং খ্রিস্টানরা রবিবারকে ধর্মীয় দিন হিসেবে নির্ধারণ করে। কিন্তু ইসলামে জুমার দিনকে আল্লাহ বিশেষভাবে মর্যাদাবান হিসেবে ঘোষণা করেছেন। (মুসলিম, হাদিস ৮৫৬)
জুমার দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো
১. জুমার নামাজে সময়মতো উপস্থিতি
শুক্রবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো জুমার নামাজ। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে, উত্তমভাবে পবিত্রতা অর্জন করে, সুগন্ধি ব্যবহার করে, সময়মতো মসজিদে গিয়ে মনোযোগসহ খুতবা শোনে—তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। (বোখারি, হাদিস ৮৮৩)
রাসুল (সা.) বলেন, “এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা, এক রমজান থেকে আরেক রমজান—এই সময়সীমা ব্যক্তির ছোটখাটো গুনাহ মুছে দেয়, যদি সে বড় গুনাহ থেকে বিরত থাকে।” (মুসলিম, হাদিস ২৩৩)
২. আগেভাগে মসজিদে যাওয়া
শুক্রবার যত আগে মসজিদে যাওয়া যায়, তত বেশি সওয়াব। কেউ যদি প্রথমে যায়, সে যেন একটি উট কোরবানি করল; এরপর যাওয়া ব্যক্তি যেন গরু, এরপর ছাগল, এরপর মুরগি, আর শেষের দিকের যেন ডিম সদকা করল—এই রকম উদাহরণে রাসুল (সা.) বুঝিয়েছেন সময়মতো উপস্থিতির গুরুত্ব। (বোখারি, হাদিস ৮৪১)
৩. গোসল ও পরিচ্ছন্নতা
জুমার দিনের গোসল শুধু শারীরিক পরিচ্ছন্নতা নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রাসুল (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি ভালোভাবে গোসল করে, আগেভাগে মসজিদে গিয়ে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে, তার প্রতি কদমের বদলে এক বছরের রোজা ও নামাজের সওয়াব দেওয়া হয়।” (আবু দাউদ, হাদিস ৩৪৫)
৪. সুরা কাহাফ তিলাওয়াত
জুমার দিনের অন্যতম আমল হলো সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করা। রাসুল (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পাঠ করে, তা তার জন্য দুই জুমার মাঝখানে আলো হয়ে থাকবে।” (মুসতাদরাক হাকিম, ২/৩৯৯)
৫. দোয়া কবুলের মুহূর্ত
শুক্রবার এমন একটি সময় রয়েছে যখন বান্দার দোয়া নিশ্চয় কবুল হয়। হাদিসে এসেছে, “এই সময়টি আসরের পর খোঁজ করো।” (আবু দাউদ ১০৪৮)
৬. বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ
জুমার দিনে রাসুল (সা.)-এর ওপর বেশি দরুদ পড়া বিশেষভাবে ফজিলতপূর্ণ। রাসুল (সা.) বলেন, “তোমাদের সবচেয়ে উত্তম দিন হলো শুক্রবার। এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এবং এই দিনেই শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে। তাই এই দিনে বেশি বেশি আমার ওপর দরুদ পড়ো।” (আবু দাউদ ১০৪৭)
নারীদের জন্য জুমার আমল
যদিও জুমার নামাজ মূলত পুরুষদের জন্য ফরজ, তবুও নারীরা ঘরে বসে জোহরের নামাজ আদায় করে এ দিনের বরকত লাভ করতে পারেন। নারীদের জন্য উত্তম হলো—ঘরের নির্জন স্থানে নামাজ আদায় করা। (মুসনাদে আহমদ ২৬৫৪২)
তাঁরাও সুরা কাহাফ পাঠ, দরুদ শরিফ, গোসল, নখ কাটা এবং পরিপাটি হওয়া ইত্যাদি আমলের মাধ্যমে জুমার দিনের সাওয়াব অর্জন করতে পারেন। এমনকি তারা পরিবারের সদস্যদের ভালো কাজে উৎসাহিত করেও সওয়াব পেতে পারেন। কারণ রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে সৎ পথে ডাকে, তার অনুসারীর সওয়াবের সমান সওয়াব সে পাবে।” (আবু দাউদ ৪৬০৯)