ডিজিটাল যুগে শিক্ষার্থী আন্দোলনের নতুন বাস্তবতা: সরকারের জন্য বাড়ছে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ভারতে শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আন্দোলন এবং বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের মধ্যে মিল খুঁজছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক, বিকেন্দ্রীভূত এবং দ্রুত বিস্তার লাভকারী এসব আন্দোলন এখন যেকোনো সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

ভারতে সুপ্রিম কোর্টের এক শুনানিতে প্রধান বিচারপতির ‘ককরোচ’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের সূচনা হয়। পরে প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজারো শিক্ষার্থী ও তরুণ সমবেত হন। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে সরকার শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের কয়েকটি দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের বেশ কিছু মিল রয়েছে। ওই সময় রাজধানীর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে। পরবর্তীতে সরকার সড়ক পরিবহন আইন পাস করলেও আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ছাত্রলীগের ভূমিকা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

পর্যবেক্ষকদের দাবি, ওই আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

সম্প্রতি এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে অতিবর্ষণের মধ্যে পরীক্ষা আয়োজন এবং শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের একটি ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ফোনালাপে পরীক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে করা ‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শিক্ষামন্ত্রী সংসদে দুঃখ প্রকাশ করলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় না। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংগঠিত হওয়ায় অল্প সময়েই দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে সরকারের জন্য প্রচলিত রাজনৈতিক কৌশলে এসব আন্দোলন মোকাবিলা করা তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে উঠছে।

তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি রাজনৈতিকভাবে সচেতন। তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে তারা দ্রুত তথ্য যাচাই করতে পারে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান গড়ে তোলে।

এদিকে শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে উপাচার্য এবং অধ্যক্ষ নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি ও গবেষণার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষক রাজনীতির প্রভাবও উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষার্থীদের পাঠদান মূল্যায়নে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করা এবং শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তাদের ভাষ্য, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনের চেয়ে শিক্ষার্থী ও তরুণদের ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তাই সংকট তৈরি হওয়ার আগেই শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা এবং প্রশাসনিক সংবেদনশীলতা বজায় রাখাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।