আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া থেকে
লাল-সাদা-নীল রঙে সেজেছে পুরো মালয়েশিয়া। বাড়ির ছাদ, দোকান, অফিস, সড়ক কিংবা আবাসিক এলাকা—সবখানেই উড়ছে জাতীয় পতাকা ‘জালুর জেমিলাং’। কোথাও পতাকার আদলে বর্ণিল সাজসজ্জা, কোথাও দেশাত্মবোধক গানের সুর। শিশু থেকে প্রবীণ সব বয়সী মানুষই ব্যস্ত ৩১ আগস্টের জাতীয় দিবস ‘মেরদেকা’ উদযাপনের প্রস্তুতিতে।
মেরদেকার আর মাত্র একদিন বাকি। এরই মধ্যে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আবহ। পুরোনো দেশাত্মবোধক গানের সুরে জেগে উঠছে স্বাধীনতার স্মৃতি, পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠে যুক্ত হচ্ছে নতুন গান। পতাকা, গান, পোশাক ও নানা ব্যতিক্রমী উদ্যোগে যেন একটাই বার্তা দেশপ্রেম কোনো নির্দিষ্ট দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান এক অনুভূতি।
দশকের পর দশক ধরে মালয়েশীয়দের হৃদয়ে জায়গা করে আছে ‘৩১ আগস্ট’, ‘ঐতিহ্য’, ‘আনুগত্য’, ‘স্বাধীনতার নৌযাত্রা’, ‘আমি মালয়েশিয়ার সন্তান’ ও ‘জালুর জেমিলাং’-এর মতো দেশাত্মবোধক গান। আগস্ট এলেই রেডিও, টেলিভিশন, স্কুল ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানস্থলে আবারও বেজে ওঠে এসব গান। সহজ সুর ও আবেগঘন কথার কারণে গানগুলো এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
বিশিষ্ট মালয়েশীয় সুরকার দাতুক মোখজানি ইসমাইলের মতে, ১৯৫০-এর দশক থেকে দেশটিতে শত শত দেশাত্মবোধক গান তৈরি হয়েছে। জাতীয় দিবসের প্রতিপাদ্য সংগীত চালুর প্রচলন শুরু হয় ১৯৭০ সালে। এরপর বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য দেশাত্মবোধক গান তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো বছর জাতীয় দিবস ও মালয়েশিয়া দিবসের জন্য একই গানও ব্যবহার করা হয়েছে।
এবারের জাতীয় দিবসের প্রতিপাদ্য সংগীত ‘আমি অঙ্গীকার করছি’ লিখেছেন ও গেয়েছেন জনপ্রিয় শিল্পী ফাইজাল তাহির। নতুন এ গানও এরই মধ্যে শ্রোতাদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।
মোখজানি বলেন, পুরোনো দেশাত্মবোধক গানগুলোর জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে স্মৃতিকাতরতা, নিয়মিত প্রচার এবং সহজে মনে থাকার মতো সুর ও কথা। কোনো গানের প্রথম কয়েকটি সুর শুনলেই মানুষের মধ্যে আবেগ তৈরি হয় এবং জেগে ওঠে দেশপ্রেমের চেতনা।
তবে নতুন গান দ্রুত জনপ্রিয় হওয়া কঠিন বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, ভালো গান দ্রুত মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও দীর্ঘদিন ধরে মানুষের স্মৃতিতে জায়গা করে নিতে নিয়মিত প্রচার প্রয়োজন। জাতীয় দিবসের সময় নতুন গান ব্যাপকভাবে প্রচার পেলেও উৎসব শেষ হওয়ার পর অনেক গানই রেডিও-টেলিভিশন থেকে হারিয়ে যায়। পরের বছর নতুন গান আসায় পুরোনোগুলোর প্রচার আরও কমে যায়।
তরুণ শিল্পী ও সুরকারদের দেশাত্মবোধক গান তৈরির আগ্রহকে অবশ্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন মোখজানি। এরনি জাকরি, খাই বাহার, আইনা আবদুল, স্ট্যাসি, ফাইজাল তাহির ও দাতুক সেরি সিতি নূরহালিজার মতো জনপ্রিয় শিল্পীদের দেশাত্মবোধক গানে সম্পৃক্ততাকেও তিনি আশাব্যঞ্জক বলে মনে করেন।
‘আতুক মেরদেকা’র দেশপ্রেম
জাতীয় পতাকা এখন অনেকের কাছেই শুধু একটি প্রতীক নয়; দেশপ্রেম প্রকাশের মাধ্যম। এর ব্যতিক্রমী উদাহরণ ৬৬ বছর বয়সী সাহরান হুসিন। মেরদেকা মাসজুড়ে জাতীয় পতাকার নকশাখচিত পোশাক পরে ফল বিক্রি করছেন তিনি। মাথায় থাকে একই নকশার বিশেষ টুপি। ব্যতিক্রমী পোশাকের কারণে শিশুদের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছেন ‘আতুক মেরদেকা’ অর্থাৎ ‘মেরদেকার দাদু’ নামে।
কুয়ালা পিলাহ কৃষক বাজারে এক অনুষ্ঠানে সাহরান বলেন, কাউকে দেখানোর জন্য নয়, মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমের চেতনা জাগিয়ে তুলতেই তিনি এভাবে পোশাক পরেন।
তার ভাষায়, ‘আমার বিশ্বাস, প্রত্যেকের হৃদয়ে মেরদেকার চেতনা থাকা উচিত। শিশুরা আমাকে দেখলে “আতুক মেরদেকা” বলে ডাকে। আমার পোশাকের প্রশংসা করে। এতে আমার খুব ভালো লাগে।’
শিশুদেরও জাতীয় পতাকার নকশাখচিত পোশাক পরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পরেরবার তোমরাও এ ধরনের পোশাক পরবে।’ সাহরানের এ উদ্যোগে সহযোগিতা করেছেন তামপিনের এক বন্ধু। জাতীয় পতাকা কেটে সেলাই করে তিনিই তৈরি করে দিয়েছেন বিশেষ টুপিটি।
সাজসজ্জায় সম্প্রীতির বার্তা
তেরেংগানুর ফেলদা বেলারায়ও জাতীয় মাস ঘিরে চলছে ব্যতিক্রমী আয়োজন। ‘উজ্জ্বলতায় মেরদেকার উৎসব’ প্রতিপাদ্যে ১০টি আবাসিক ব্লক সাজিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করেছেন এক হাজারের বেশি বাসিন্দা।
প্রায় ১০ বছর ধরে জাতীয় দিবস উপলক্ষে এ আয়োজন করে আসছে স্থানীয় সম্প্রদায়। প্রতিটি ব্লকে রয়েছে প্রায় ২৩টি বাড়ি। সাজসজ্জার জন্য প্রতিটি ব্লককে দেওয়া হয়েছে ৪০০ রিঙ্গিত করে। এর পাশাপাশি অনেক বাসিন্দা নিজেদের অর্থ ব্যয় করছেন।
আয়োজক মোহাম্মদ নূর ইসমাইল বলেন, শিশু, তরুণ ও প্রবীণ সব বয়সী মানুষ একসঙ্গে এ কাজে অংশ নিচ্ছেন। পুরোনো টায়ার, প্লাস্টিকের বোতলসহ পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে আকর্ষণীয় সাজসজ্জা। ফলে জাতীয় দিবস উদযাপনের পাশাপাশি পরিবেশ সচেতনতার বার্তাও ছড়িয়ে পড়ছে।
তার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে দেশপ্রেমের চেতনা তৈরি করা। এখন প্রায় প্রতিটি বাড়ি ও ভবনেই উড়ছে জাতীয় পতাকা।
সারা বছর দেশাত্মবোধক গান
বিশিষ্ট গীতিকার দাতুক হাসবাহ হাসান মনে করেন, দেশাত্মবোধক গানকে জনপ্রিয় করতে সারা বছর প্রচারের ব্যবস্থা করা দরকার। শুধু সরকারি গণমাধ্যমের ওপর এ দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না। বেসরকারি সম্প্রচারমাধ্যমের পাশাপাশি শপিং মল, হোটেল, বিমানবন্দর ও গণপরিবহণেও সারা বছর এসব গান বাজানো উচিত।
তার মতে, নিয়মিত শুনতে শুনতে একসময় দেশাত্মবোধক গান মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠবে। তরুণ প্রজন্মও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব গানের সঙ্গে গলা মেলাবে।
পতাকার রঙে, গানের সুরে, ঘর সাজানোর আনন্দে কিংবা ‘আতুক মেরদেকা’র ব্যতিক্রমী পোশাকে মালয়েশিয়ায় মেরদেকা এখন দেশপ্রেম প্রকাশের বহুমাত্রিক উৎসব। সাধারণ মানুষ, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের ছোট ছোট উদ্যোগে নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে স্বাধীনতার চেতনা।
১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে মালয়েশিয়া। সেই ঐতিহাসিক দিনটি দেশটিতে ‘মেরদেকা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। স্বাধীনতার ৬৯ বছর পূর্তির প্রাক্কালে এবারও পতাকা, গান আর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মেরদেকার সুরে মুখরিত হয়ে উঠবে পুরো মালয়েশিয়া।
