আহমাদুল কবির | মালয়েশিয়া:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের জন্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটাধিকার নিশ্চিত হওয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে তৈরি হয়েছে তুমুল আলোচনা, বিতর্ক ও রাজনৈতিক প্রচারণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি। কে কতটা লাভবান হবে তা নিয়েই সবচেয়ে বেশি কথাবার্তা।
এক পক্ষ দাবি করছে, এবারের নির্বাচনে জামায়াতের বিজয় মুকুটে ‘কোহিনূর’ হয়ে উঠবে প্রবাসী ভোট। অন্যদিকে বিএনপিপন্থী প্রবাসীরা এই বক্তব্যকে দেখছেন অতিরঞ্জিত, বাস্তবতাবিবর্জিত ও রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হিসেবে।
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচার বনাম মাঠের বাস্তবতা
বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত মালয়েশিয়া প্রবাসী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ফেসবুক বা ইউটিউবে যে প্রচার দেখা যাচ্ছে, সেটাই বাস্তবতা নয়। দেশের মূল ভোটাররা এখনো সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক রাজনীতির বাইরে। তাদের সিদ্ধান্ত আসে ভিন্ন হিসাব-নিকাশ থেকে।
তার মতে, প্রবাসী ভোট নিয়ে অতিরিক্ত হাইপ মূলত রাজনৈতিক দুর্বলতা আড়াল করার কৌশল।
প্রবাসে, বিশেষ করে মালয়েশিয়ায়, জামায়াতপন্থীদের সংগঠিত প্রচারণা ও দৃশ্যমান তৎপরতার কারণেই ‘প্রবাসী ভোটে জামায়াত এগিয়ে’ এই ধারণা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।
প্রবাসী ভোট কি সত্যিই ফল নির্ধারণী?
একজন প্রবাসী রাজনৈতিক নেতা বলেন, বাস্তবতা হলো ১ থেকে দেড় কোটির বেশি প্রবাসীর বড় একটি অংশ এখনো ভোটার তালিকার বাইরে। আবার অনেক প্রবাসী ১৮ বছরের নিচে। সংসদীয় আসনভিত্তিক হিসাব করলে বহু আসনে প্রবাসী ভোটার সংখ্যা খুবই সীমিত।
দেশে থাকা বিপুল সংখ্যক ভোটারই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবে। প্রবাসী ভোটকে ‘গেম চেঞ্জার’ বানানো অনেকটাই কল্পনাপ্রসূত।
প্রবাসী বিএনপি সমর্থক আবদুল মান্নান বলেন, আমরা চাই প্রবাসীদের ভোটাধিকার থাকুক। কিন্তু এই ভোট দিয়ে সরকার গঠন হবে এমন ভাবনা বাস্তবসম্মত নয়। সরকারের ভাগ্য নির্ধারিত হবে দেশের জনগণের ভোটেই।
তার মতে, বিএনপির মূল শক্তি গ্রাম-শহরের সাধারণ ভোটার, আর প্রবাসীরা সেই আন্দোলনের নৈতিক সমর্থন।
কত ভোট, কোন আসনে কেউ জানে না। একটি আসনে কতজন প্রবাসী ভোটার আছেন, কতজন পোস্টাল ব্যালট দিয়েছেন বা কতজন দেশে গিয়ে ভোট দেবেন এই পরিসংখ্যান কারও কাছেই স্পষ্ট নয়।
একজন বিএনপিপন্থী প্রবাসী বিশ্লেষক বলেন, কোনো আসনে ব্যবধান যদি ৫০০ ভোট হয়, সেখানে প্রবাসী ভোটার ২০০ না ৩০০—তা কে জানে? আর সবাই কি একই প্রতীকে ভোট দেবে? তাই প্রচারণার গল্পগুলো রাজনৈতিক কল্পকাহিনি ছাড়া কিছু নয়।
জামায়াতের ‘কোহিনূর’ বনাম বিএনপির ‘রঙিন কাঁচ’
মালয়েশিয়ায় বিএনপির এক সাবেক সমন্বয়ক বলেন, যে দল এককভাবে ১০–১৫টি আসনেও জিততে পারে না, তারা যদি স্বল্পসংখ্যক প্রবাসী ভোটে শত আসনের স্বপ্ন দেখে তা রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যায় না।
তবে তিনি স্বীকার করেন, এই প্রচারণা ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াচ্ছে। একদিকে জামায়াত ‘কোহিনূর’ দেখাচ্ছে, অন্যদিকে বিএনপি সেটিকে ‘রঙিন কাঁচ’ হিসেবে তুলে ধরছে। এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই জমে উঠেছে।
পোস্টাল ব্যালট: আগ্রহ আছে, অংশগ্রহণ কম
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবাসী অধ্যাপক জানান, প্রবাসীদের মধ্যে ভোটাধিকার পেয়ে আনন্দ থাকলেও বাস্তবে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার হার কম।
যারা ভোট দিচ্ছেন, তাদের বড় অংশ বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মী ও সমর্থক। জামায়াতের ডেডিকেশন বেশি হলেও মোট ভোটের হিসেবে বিএনপিই এগিয়ে থাকবে বলে তিনি মনে করেন।
আরেক শ্রেণির প্রবাসী ভোটার পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আলাপ করে দেশের পরিস্থিতি বুঝে ভোট দিচ্ছেন। পরিবারের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা।
তার ভাষায়, একটি ভোট ফল বদলে দিতে পারে সেটা প্রবাসী ভোটও হতে পারে।
এদিকে পোস্টাল ব্যালটের পাশাপাশি সরাসরি দেশে গিয়ে ভোট দিতে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বহু প্রবাসী বাংলাদেশি। বিমান টিকিট বুকিং, ছুটির আবেদন, পরিবারকে আগাম জানানো—সব মিলিয়ে প্রবাসজীবনে এখন নির্বাচনী আমেজ।
মালয়েশিয়া বিএনপির দপ্তর সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রতন জানান, ইতিমধ্যে মালয়েশিয়া বিএনপির সভাপতি প্রকৌশলী বাদলুর হমান খান বাদল, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও মালয়েশিয়া বিএনপির সাধারন সম্পাদক মোশাররাফ হোসেন, মালয়েশিয়া বিএনপির প্রতিষ্টাতা সাধারন সম্পাদক ও বর্তমান সহ সভাপতি তালহা মাহমুদ, মালয়েশিয়া বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা সালাহ উদ্দিনসহ প্রায় দেড় শতাধিক নতা-কর্মী দেশে অবস্হান করছেন। তারা দলের হয়ে নির্বাচনী প্রচার প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছেন। দপ্তর সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রতন আজ মালয়েশিয়া থেকে দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে কুয়ালালামপুর, সেলাঙ্গর, জোহর ও পেনাং অঞ্চলের প্রবাসীরা জানান, বাংলাদেশগামী ফ্লাইটের টিকিটের চাহিদা হঠাৎ বেড়েছে। ট্রাভেল এজেন্সিগুলোও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এক প্রবাসীর ভাষায়, ভোট দেওয়া শুধু অধিকার নয়, এটা নাগরিক দায়। এই ভোটে অংশ না নিলে নিজের কাছেই অপরাধবোধ কাজ করবে।
আবেগ, দায়িত্ব আর বাস্তবতার টানাপোড়েন
সব প্রবাসীর পক্ষে দেশে যাওয়া সম্ভব নয়, উচ্চ টিকিট মূল্য, কাজ হারানোর ঝুঁকি ও সীমিত ছুটি বড় বাধা। তবু যারা যাচ্ছেন, তারা অন্যদের পক্ষ থেকেও এক ধরনের প্রতিনিধিত্ব করছেন বলে মনে করছেন অনেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসীদের এই যাত্রা শুধু ভোটার উপস্থিতিই বাড়াবে না, বরং প্রবাসীদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও সম্পৃক্ততার শক্ত বার্তাও দেবে।
হাজার মাইল দূরে থেকেও বাংলাদেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্র প্রবাসীদের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত—একটি ব্যালটের সিলের জন্য প্রবাসজীবনের স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে দেশে ফেরা তারই প্রমাণ।
