ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের ষষ্ঠ দিন: মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হামলা-পাল্টা হামলা, বাড়ছে নিহত ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইলকে ঘিরে চলমান সংঘাত ষষ্ঠ দিনে আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। বৃহস্পতিবার বিভিন্ন দিক থেকে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় পুরো অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। ইরান একদিকে ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলও পাল্টা সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এদিন ইউরোপের দেশ আজারবাইজানেও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার জন্য ইরানকে দায়ী করা হলেও তেহরান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এ পর্যন্ত সংঘর্ষ মূলত আকাশপথে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন যুদ্ধকে স্থলভাগে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যুদ্ধকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এমনকি ইরাকে অবস্থানরত কুর্দি যোদ্ধারা স্থলপথে ইরানে প্রবেশ করেছে বলেও খবর ছড়িয়েছে। তবে কুর্দিদের পক্ষ থেকে এ দাবি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়েছে।

যুদ্ধের তীব্রতার মধ্যে পারস্য উপসাগরে একটি মার্কিন ট্যাংকারে হামলার দাবি করেছে ইরান। একই সঙ্গে তারা একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার কথাও জানিয়েছে। চলমান হামলায় ইসরাইলে প্রায় এক হাজার ৫০০ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। ইসরাইলে এ পর্যন্ত ১১ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৩‍০ জনে।

এদিকে লেবাননেও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। সেখানে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া ইরানের হামলায় দুই কুয়েতি সেনাসহ চারজন নিহত হয়েছেন এবং ছয় মার্কিন সেনাও নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

তেহরান ছেড়েছে প্রায় এক লাখ মানুষ

মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, হামলার প্রথম দুই দিনেই প্রায় এক লাখ মানুষ রাজধানী তেহরান ছেড়ে চলে গেছে।

লেবাননেও পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সেখানে অন্তত ৫৮ হাজার মানুষ অন্যের বাড়ি, রাস্তা কিংবা খোলা মাঠে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। তেহরানের এক বাসিন্দা বলেন, “১২ দিনের যুদ্ধের সময় আমরা যে পরিস্থিতি দেখেছিলাম, এবার তার চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা। প্রতিদিনের হামলা এত তীব্র যে প্রতিটি দিন যেন এক মাসের মতো মনে হচ্ছে।”

ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ইসরাইলের হামলা

ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের কোম শহরে রাতভর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, ওই শহর থেকে ইসরাইলে হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। একই সঙ্গে ইসফাহান শহরের একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়ও হামলা চালানো হয়েছে।

অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বেসামরিক এলাকায় হামলা চালাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেবল কূটনীতির সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, বরং তাকে নির্বাচিত করা আমেরিকান জনগণের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।

পারস্য উপসাগরে মার্কিন ট্যাংকারে হামলার দাবি

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, পারস্য উপসাগরে তাদের নৌবাহিনী একটি মার্কিন ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উত্তর পারস্য উপসাগরে জাহাজটিতে আঘাত হানার পর সেটিতে আগুন ধরে যায়।

এর আগে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অর্গানাইজেশন জানিয়েছিল, কুয়েত উপকূলের কাছে একটি ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা

ইরানের তাসনিম সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন, ইউরোপীয় বা ইসরাইলি জাহাজ দেখা গেলে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। একই সঙ্গে যুদ্ধকালীন সময়ে নৌযান চলাচল ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলেও তারা দাবি করেছে।

আজারবাইজানে ড্রোন হামলা নিয়ে বিতর্ক

আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানি ড্রোন হামলায় দেশটিতে দুই বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। একটি ড্রোন নাখচিবান অঞ্চলের বিমানবন্দরের টার্মিনালে আঘাত হানে এবং আরেকটি ড্রোন শাকারাবাদ গ্রামের একটি বিদ্যালয়ের কাছে পড়ে।

তবে ইরান জানিয়েছে, এ হামলার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

উপসাগরীয় অঞ্চলেও বিস্ফোরণ ও হামলা

কুয়েতে মার্কিন বাহিনীর ঘাঁটি আরিফজানে ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। এর আগে কুয়েতে হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

অন্যদিকে কাতারের রাজধানী দোহায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে মার্কিন দূতাবাসের আশপাশের বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সৌদি আরব ও বাহরাইনের প্রতিরোধ

বাহরাইনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ইরানের ৭৫টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১২৩টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। একইভাবে সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা তিনটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে আল খার্জ শহরের বাইরে ধ্বংস করেছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার উদ্দেশ্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তারা বলেন, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ না করা পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি কঠিন হতে পারে।

অর্থনৈতিক প্রভাব

ইসরাইলের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে দেশটির সাপ্তাহিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯ বিলিয়ন শেকেলে পৌঁছেছে।

যুদ্ধ বন্ধে আহ্বান

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি দ্রুত যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, চলমান সংঘাতের কারণে বহু বিদেশি নাগরিক বিভিন্ন দেশে আটকা পড়েছেন এবং তাদের নিরাপদে নিজ দেশে ফেরাতে সহায়তা করা হবে।

লেবাননে যুদ্ধ তীব্রতর

লেবাননে ইসরাইলের বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং দক্ষিণাঞ্চলে স্থল অভিযানও চালানো হচ্ছে। ইসরাইল ঘোষণা দিয়েছে, হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি পরাজিত না করা পর্যন্ত তাদের অভিযান চলবে।

এদিকে হিজবুল্লাহ নেতা নাইম কাসেম বলেছেন, যুদ্ধ যতই তীব্র হোক, তারা আত্মসমর্পণ করবে না।

খামেনির মৃত্যুতে ভারতের শোক

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে ভারত শোক প্রকাশ করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব তেহরানে অবস্থিত ইরান দূতাবাসে গিয়ে শোক বইতে স্বাক্ষর করেছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত আকার ধারণ করায় আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেক দেশই দ্রুত যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানালেও এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।