হরমুজ প্রণালি বন্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা: জ্বালানি ও বৈশ্বিক শিপিং সংকটে আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধাক্কার আশঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর পাল্টা প্রতিরোধ শুরু হলে পুরো অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও সামুদ্রিক পরিবহন ব্যবস্থায়। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ Strait of Hormuz বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী শিপিং খাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইরান নিয়ন্ত্রিত এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট বন্ধ থাকায় উপসাগরীয় অঞ্চলে গতকাল সকাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন লাখ কনটেইনার বোঝাই কমপক্ষে ১৪০টি মাদার ভ্যাসেল ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় সমুদ্রে অলসভাবে ভাসছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আশপাশের কোনো বন্দরে জাহাজগুলো বার্থিং নিতে পারছে না। ফলে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন।

এ পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক শিপিং ভাড়ায়। নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এবং বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার করার কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে দ্রুতগতিতে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক শিপিং প্রতিষ্ঠান সী-লেড শিপিং চীন থেকে বাংলাদেশ রুটে কনটেইনার পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।

বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার বিকেলে গ্রাহকদের কাছে পাঠানো আনুষ্ঠানিক এক চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, চীন-বাংলাদেশ রুটে ৪০ ফুট কনটেইনার পরিবহনে অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৩০০ মার্কিন ডলার চার্জ যুক্ত করা হবে।

শিপিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সী-লেডের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় অন্যান্য আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিও ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যেই তারা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে পারে।

শুধু ভাড়া বৃদ্ধি নয়, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নতুন করে ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ বা যুদ্ধ মাশুল আরোপের প্রস্তুতিও নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশি এজেন্টদের মৌখিকভাবে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী রোববার বা সোমবারের মধ্যে এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।

প্রস্তাবিত যুদ্ধ মাশুল অনুযায়ী, ২০ ফুট কনটেইনারে দুই হাজার ডলার, ৪০ ফুট কনটেইনারে তিন হাজার ডলার এবং বিশেষ পণ্যবাহী কনটেইনারে চার হাজার ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা হতে পারে।

সমুদ্রপথের পাশাপাশি আকাশপথেও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে। বিভিন্ন এয়ার কার্গো সার্ভিস কোম্পানি প্রতি কেজি পণ্যে তিন থেকে সাড়ে তিন ডলার পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এদিকে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে কার্গো পরিবহন সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে Iran, Iraq, Bahrain, Jordan, Kuwait এবং United Arab Emirates

পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে।

শিপিং খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, সমুদ্র পরিবহন একটি নির্দিষ্ট চক্র বা সাইকেলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট বন্ধ হয়ে গেলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।

এমএসসি শিপিং ইন্টারন্যাশনালের হেড অব অপারেশন আজমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, একটি প্রধান রুট বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প পথ খুঁজে নিতে হয়, যার ফলে সময় ও খরচ দুই-ই বেড়ে যায়। নতুন করে রুট পরিকল্পনা করতে গিয়ে শিপিং কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। সেই ব্যয় সমন্বয় করতেই ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই উত্তেজনা ছিল। বিশেষ করে Red Sea অঞ্চলে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের উপস্থিতির কারণে পণ্য পরিবহন ঝুঁকির মধ্যে ছিল। এখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

লজিস্টিক খাতের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্য পাঠাতে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের Cape of Good Hope ঘুরে যাওয়ার বিকল্প ছাড়া কার্যত আর কোনো পথ নেই।

কিন্তু এই পথ ব্যবহার করলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ১২ থেকে ১৫ দিন বেশি সময় লাগবে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় অন্তত ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

জিবিএক্স লজিস্টিক লিমিটেডের হেড অব অপারেশন মুনতাসির রুবায়েত বলেন, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, কনটেইনার সংকট এবং দীর্ঘ রুট ব্যবহারের কারণে সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস খাতের শীর্ষ সংগঠন Bangladesh Garment Manufacturers and Exporters Association–এর সাবেক সহসভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের অর্ডার সাধারণত নির্দিষ্ট দামে নেওয়া হয়। কিন্তু উৎপাদনের পর রপ্তানির সময় যদি পরিবহন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যায়, তাহলে ব্যবসায় বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হবে।

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ দিনের ব্যবধানে রপ্তানি করা হয়। এই সময়ের মধ্যে যদি ফ্রেইট চার্জ হঠাৎ বেড়ে যায়, তাহলে উদ্যোক্তাদের জন্য তা বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে