যুদ্ধ থামানোর ইঙ্গিত নেই: ইউক্রেন ইস্যুতে অনড় পুতিন, রাশিয়ায় সীমিত পরিসরে শুরু বিতর্ক

ইউক্রেন যুদ্ধের পঞ্চম বছরে পৌঁছেও নিজেদের অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না রাশিয়া। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে ক্রেমলিন এখনো ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে এবং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশটির বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ একসময় বলেছিলেন, “রাশিয়া যেমন, তেমনই আছে এবং তা প্রকাশ করতে আমরা লজ্জিত নই।” বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য আজকের রাশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। সম্প্রতি ক্রেমলিনে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার গ্রহণের সময় জনপ্রিয় শিল্পী নাদেঝদা বাবকিনা আরও কড়া ভাষায় বলেন, “রাশিয়া কখনো আত্মসমর্পণ করবে না। যারা এটি পছন্দ করে না, তারা গিয়ে বিষ খেতে পারে।”

এমন বক্তব্য বর্তমান রাশিয়ার মনোভাবকে প্রতিফলিত করে, যেখানে ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব নিজেদের অবস্থান নিয়ে অনড় এবং সমালোচনার প্রতি উদাসীন।

সেন্ট পিটার্সবার্গ ফোরামের মধ্যেও অব্যাহত হামলা

বার্ষিক সেন্ট পিটার্সবার্গ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরাম শুরু হওয়ার আগেই ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে আয়োজিত এই ফোরামে ১৩০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের কথা জানানো হয়েছে। তবে পশ্চিমা বিনিয়োগকারী ও রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক কম।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ রাশিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্রাম্পকে ঘিরে ক্রেমলিনের প্রত্যাশায় ভাটা

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর রাশিয়ার কর্মকর্তারা “স্পিরিট অব অ্যাঙ্কোরেজ” নিয়ে আশাবাদী মন্তব্য করেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার শর্ত মেনে নিতে চাপ দেবেন।

তবে প্রত্যাশিত কোনো শান্তি চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি। সম্প্রতি পুতিনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ প্রকাশ্যে বলেন, “স্পিরিট অব অ্যাঙ্কোরেজ বলতে আমি কিছুই বুঝি না। আমি কখনো এই শব্দ ব্যবহার করিনি।”

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি রাশিয়ার আগের আশাবাদ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত বহন করে।

যুদ্ধের চাপ বাড়ছে রাশিয়ার ভেতরেও

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংঘাতে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি রাশিয়ার অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।

ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা এখন নিয়মিতভাবে রাশিয়ার অভ্যন্তরে পৌঁছে যাচ্ছে। তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামো প্রায়ই হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। সম্প্রতি মস্কো অঞ্চলেও বড় ধরনের ড্রোন হামলা হয়, যা রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

যুদ্ধ নিয়ে সীমিত বিতর্কের আভাস

রাশিয়ার কঠোর নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমেও সম্প্রতি যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভাসিলি কাশিন এক নিবন্ধে লিখেছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে হলে পুরো দেশ দীর্ঘ সময়ের জন্য সামরিকভাবে দখল করতে হবে, যা বাস্তবিক অর্থে সম্ভব নয়।

অন্যদিকে রাজনৈতিক ভাষ্যকার আলেকজান্ডার নোসোভিচের মতে, রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ মহল এখন দুই ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়, অন্য পক্ষের বিশ্বাস, এই সংঘাত অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে থাকলে সেটিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

তবে এসব আলোচনা কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যুদ্ধ-সংক্রান্ত সমালোচনামূলক একটি নিবন্ধ প্রকাশের কিছুদিন পর সেটি অনলাইনে আর পাওয়া যায়নি। ওয়েবসাইটে “৪০৪ – পেজ নট ফাউন্ড” বার্তা দেখা যায়।

শান্তির সম্ভাবনা এখনো দূরে

সেন্ট পিটার্সবার্গ অর্থনৈতিক ফোরামে পুতিনের বক্তব্যের দিকে আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকলেও এখন পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি যে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তন করতে যাচ্ছেন।

বরং সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা এবং ক্রেমলিনের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, রাশিয়া আপাতত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পথেই রয়েছে। ফলে ইউক্রেনে সংঘাতের দ্রুত অবসানের সম্ভাবনা এখনো দূরবর্তী বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।