যুক্তরাজ্যের সমুদ্রসৈকতে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: বাংলাদেশি মা-মেয়ের বিদায়ে ইস্ট লন্ডন মসজিদে হাজারো মানুষের ঢল

ইংল্যান্ডের এসেক্সের ওয়েস্ট মার্সি সৈকতে সমুদ্রের স্রোতে ভেসে প্রাণ হারানো মা ও মেয়ে সেলিনা রহমান ও তার কিশোরী কন্যা সামিয়ার জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলে অবস্থিত ইস্ট লন্ডন মসজিদে অনুষ্ঠিত জানাজায় শোকাহত মানুষ অংশ নেন। এ ঘটনায় ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটিতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্ত্রী ও মেয়েকে হারিয়ে শোকাহত বাবা ডা. মনসুর রহমান উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ, হাসপাতালের চিকিৎসাকর্মী এবং জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। দ্য সান-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৪৯ বছর বয়সী ডা. রহমান বলেন, তিনি এখনও গভীর মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

তিনি বলেন, “আমি আমার মেয়েকে হারিয়েছি, আমি আমার স্ত্রীকে হারিয়েছি। দয়া করে তাদের জন্য দোয়া করবেন।”

জানা গেছে, প্রায় দুই দশক আগে লন্ডনে পরিচয়ের পর যুক্তরাজ্যেই সেলিনা রহমানকে বিয়ে করেন ডা. মনসুর রহমান। দুর্ঘটনার সময় তিনি লন্ডনে ছিলেন। পরে এক বন্ধুর ফোনে পরিবারের ওপর নেমে আসা ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবর জানতে পারেন।

ডা. রহমান বলেন, কোলচেস্টার হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মীরা তাদের প্রতি অত্যন্ত মানবিক ও সম্মানজনক আচরণ করেছেন। পাশাপাশি এসেক্স পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় কমিউনিটি এবং উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।

তিনি বলেন, “যারা ঘটনাস্থলে ছিলেন, যারা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, এমনকি যেসব নারীও আমার সন্তানদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন, তাদের প্রতি হৃদয়ের গভীর থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার পরিবারের পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ।”

নিহত সেলিনা রহমানের বাবা ও সামিয়ার নানা মুজিবুর রহমানও সবার কাছে মেয়ে ও নাতনির জন্য দোয়া চেয়েছেন। তিনি বলেন, এখনও তিনি এই মর্মান্তিক ঘটনা মেনে নিতে পারছেন না। একই সঙ্গে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছোট শিশুটির দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।

এর আগে এসেক্স পুলিশ জানায়, গত ২২ জুলাই বিকেল ৫টা ৩৫ মিনিটে সিভিউ অ্যাভিনিউ সংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় কয়েকজন পানিতে বিপদে পড়ার খবর পেয়ে জরুরি সেবা সংস্থাগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছে। ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চালানো হলেও এক কিশোরী ও চল্লিশোর্ধ্ব এক নারীর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অপর এক শিশু গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, জোয়ারের পানি খুব দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একটি শিশু বালুচরের কাছে একটি ইনফ্ল্যাটেবল ভাসমান খেলনা নিয়ে খেলতে গিয়ে বিপদে পড়ে। তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে একের পর এক মানুষ সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

স্থানীয় বাসিন্দা স্টিফেন ভিন্স বলেন, ওয়েস্ট মার্সি সৈকতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি তারা দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন। কয়েক বছর আগেও একই স্থানে নিজের সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে এক ব্যক্তি প্রাণ হারান। তার মতে, কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে এমন দুর্ঘটনা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

পরিবারের বন্ধু মিশবা উদ্দিন জানান, নিহতরা সবাই লন্ডন থেকে এক দিনের ভ্রমণে ওয়েস্ট মার্সি সৈকতে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “তারা অত্যন্ত ভদ্র, সবার প্রিয় ও সম্মানিত একটি পরিবার। এই ঘটনা পুরো কমিউনিটিকে শোকাহত করেছে।”

এদিকে, এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় পুরো ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের আবহ বিরাজ করছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন নিহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটির দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন।

সূত্র: দ্য সান