ইউনূস সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ, শেখ হাসিনা আমলের উন্নয়ন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক

ইসমাইল হোসাইন রায়হান:
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং আসন্ন রাজনৈতিক রোডম্যাপ—সব মিলিয়ে সরকারের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দেশবাসী। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আস্থা পুনর্গঠন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতা এড়ানো এবং সব পক্ষকে নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তার আমলে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ উদ্যোগের মতো বড় অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। সমর্থকদের মতে, এসব প্রকল্প দেশের যোগাযোগ, শিল্প ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।শেখ হাসিনার শাসনামলে যুদ্ধ ছাড়াই সমুদ্র বিজয় থেকে উন্নয়ন বিপ্লব। টানা এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ কূটনৈতিক সাফল্য, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় অতিক্রম করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ ছাড়াই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের ও মিয়ানমারের বিপক্ষে সমুদ্রসীমা নির্ধারণে বিজয় অর্জন ছিল এ শাসনামলের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য।
আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকা, ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ) এবং ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপান এলাকায় সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ, নীল অর্থনীতি ও জ্বালানি অনুসন্ধানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে কেবল কূটনৈতিক সাফল্যই নয়, উন্নয়ন খাতেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রাম থেকে শহর—প্রায় সর্বত্র বিদ্যুতের আওতা নিশ্চিত হয়েছে।
এ সময় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও নারীর ক্ষমতায়নেও অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। রোহিঙ্গা সংকটে মানবিক নেতৃত্ব, শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে সোচ্চার অবস্থান বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য ও উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার শাসনামল বাংলাদেশের জন্য একদিকে কূটনৈতিক আত্মবিশ্বাস, অন্যদিকে অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও, রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্জন ও সাফল্যের বিষয়গুলো ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, উন্নয়নের পাশাপাশি ওই সময়কালে সুশাসন, গণতান্ত্রিক চর্চা ও মানবাধিকার প্রশ্নেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, যা বর্তমান সংকটের পটভূমি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউনূস সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতীতের উন্নয়ন অর্জনকে ধরে রেখে একটি স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার দিকে দেশকে এগিয়ে নেওয়া। আগামী মাসগুলোতে সরকারের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ।