ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে স্থায়ী ক্ষতির মুখে ঠেলে দিতে পারে। পরিস্থিতিকে তারা বলছেন “ডিমান্ড ডিকস্ট্রাকশন” বা “চাহিদা ধ্বংস”, যেখানে অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ তাদের দৈনন্দিন ব্যয়ের অভ্যাস স্থায়ীভাবে বদলে ফেলতে বাধ্য হয়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, ইতিহাসের অন্যতম গুরুতর তেল সরবরাহ সংকটের কারণে এই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত বাড়তে থাকা জ্বালানি তেলের দাম সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও কর ফেরতের অর্থ কমিয়ে দিচ্ছে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ, যাদের অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দেওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত।
আরএসএম ইউএস-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ জো ব্রুসুয়েলাস বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য এটি মোটেও অনুকূল সময় নয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিতে ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করছে। প্রথমে পরিবার ও ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। এরপর মানুষের আত্মবিশ্বাস কমে গিয়ে বিলাসী পণ্যের খরচ কমছে। গাড়ি ও বাড়ির মতো বড় বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ছে। ব্যবসায় মুনাফা কমে যাওয়ায় ছাঁটাই ও ব্যয় সংকোচন শুরু হচ্ছে। একই সঙ্গে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ালে মন্দার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় শুধু তেল নয়, সার ও শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে আগামী মাসগুলোতে খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডেভিড ওর্তেগা জানিয়েছেন, খাদ্যমূল্যের প্রকৃত প্রভাব পুরোপুরি বোঝা যেতে আরও ছয় মাস বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।
তবে অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ ন্যান্সি ভ্যানডেন হাউটেন কিছুটা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তার মতে, যুদ্ধবিরতি এবং তেলের দাম আংশিক স্থিতিশীল হওয়ায় আপাতত বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। যদিও পরিস্থিতি যে কোনো সময় বদলে যেতে পারে।
এই সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যেই সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের জীবনে পড়তে শুরু করেছে। ৩০ বছর বয়সী প্রকৌশলী ব্রায়ান ঘরে বসে কাজের পরিমাণ বাড়িয়েছেন এবং রান্নাঘর সংস্কারের পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। অন্যদিকে উবারচালক উইল জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দূরপাল্লার ট্রিপ নেওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। ফিনিক্সের বাসিন্দা সিয়ান জানিয়েছেন, তেলের উচ্চমূল্যের কারণে তিনি চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পর্যন্ত বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ এখনই শেষ হলেও অর্থনৈতিক ক্ষতি দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। পারস্য উপসাগরের তেল উৎপাদন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগতে পারে।
জো ব্রুসুয়েলাসের ভাষায়, “নিম্ন আয়ের বহু আমেরিকানের জন্য এটাই হয়তো নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে উঠছে।”
