যুক্তরাজ্যের মূলধারার রাজনীতিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনীতিক Tahmina Saleem। ইংল্যান্ডের Luton বরো কাউন্সিলের নতুন নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে কাউন্সিলের নেতৃত্ব দেওয়া Hazel Simmons দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পর Labour Party-এর পক্ষ থেকে তাহমিনা সেলিমকে নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। একই সঙ্গে হাই টাউন এলাকার কাউন্সিলর Umme Ali-কে কাউন্সিলের উপনেতার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর তাহমিনা সেলিম এটিকে “বিশাল দায়িত্ব” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তার পূর্বসূরি এমন একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে গেছেন, যার ওপর দাঁড়িয়ে লুটনের জন্য আরও সমৃদ্ধ ও ইতিবাচক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।
জনসেবা ও কমিউনিটি উন্নয়নে দীর্ঘ পথচলা
সামাজিক গবেষণা, জনকল্যাণ এবং কমিউনিটি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তাহমিনা সেলিমের। নব্বইয়ের দশকে ইয়র্কশায়ারে তরুণ পরিচর্যাকারীদের জন্য একটি সহায়তা প্রকল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
২০০৭ সালে লুটনে বসবাস শুরু করার পর তিনি সংস্কৃতি, স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটি উন্নয়ন খাতে কাজ করেন। ২০১৯ সালে প্রথমবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে রাউন্ড গ্রিন ও বিসকট এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন। পরে তিনি শহরের মেয়র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
শিশু ও পরিবার সেবায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য
২০২১ সালে শিশু, পরিবার ও শিক্ষা বিষয়ক দায়িত্ব গ্রহণের সময় স্থানীয় শিশু সেবা বিভাগ নানা সমালোচনার মুখে ছিল। তবে দুই বছরের মধ্যেই সেই বিভাগ বিশেষ পর্যবেক্ষণ তালিকা থেকে বেরিয়ে আসে।
তাহমিনা সেলিমের ভাষায়, এই উন্নয়নের পেছনে ছিল নিবিড় পরিশ্রম, দলগত প্রচেষ্টা এবং শিশুদের কল্যাণে আন্তরিক প্রতিশ্রুতি।
‘লুটন ২০৪০’ বাস্তবায়ন হবে প্রধান অগ্রাধিকার
নতুন নেতা হিসেবে তার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো ‘লুটন ২০৪০’ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে শহরটিকে আরও স্বাস্থ্যকর, ন্যায়ভিত্তিক এবং টেকসই নগরীতে রূপান্তর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, দারিদ্র্য বর্তমানে লুটনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। তার প্রতিনিধিত্ব করা বিসকট এলাকায় প্রায় ৪৮ শতাংশ শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে, যা উদ্বেগজনক।
এ কারণে দারিদ্র্য হ্রাস, জনসেবার মানোন্নয়ন এবং সামাজিক বৈষম্য কমানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য শহর গঠনের অঙ্গীকার
শহরের পরিচ্ছন্নতা, অবৈধভাবে ময়লা ফেলা রোধ এবং পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য প্রায় ৩০ লাখ পাউন্ড ব্যয়ে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান তাহমিনা সেলিম।
তার মতে, স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ আসে শহরের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে। তাই আগামী এক বছরের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি।
এ ছাড়া পার্কিং বিশৃঙ্খলাকেও বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ফুটপাত দখল করে গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে পথচারীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং এটি শহরের শৃঙ্খলার জন্যও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বৈচিত্র্যই লুটনের সবচেয়ে বড় শক্তি
নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও লুটনকে সম্ভাবনাময় একটি শহর হিসেবে দেখছেন নতুন এই নেতা। তার মতে, শহরের প্রায় ২৩ শতাংশ বাসিন্দার বয়স ১৬ বছরের নিচে, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত লুটন কার্নিভালের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শহরটির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, সৃজনশীলতা এবং প্রাণশক্তির অসাধারণ প্রতিফলন দেখা গেছে সেখানে।
আগামী স্থানীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তাহমিনা সেলিম বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও লুটনের মানুষ সবসময় শহরের বৃহত্তর স্বার্থকে গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন,
“লুটনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বৈচিত্র্য। বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতিগত পটভূমির মানুষ এখানে একসঙ্গে বসবাস করেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং সম্প্রীতির এই পরিবেশই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।”
নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে দারিদ্র্য মোকাবিলা, পরিচ্ছন্ন নগর গঠন, জনসেবার মানোন্নয়ন এবং সামাজিক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাহমিনা সেলিম। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, তার নেতৃত্বে লুটন আগামী বছরগুলোতে আরও আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বাসযোগ্য শহরে পরিণত হবে।
