কলকাতার ধর্মতলায় এক অবস্থান কর্মসূচি থেকে বাংলাদেশের আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ড নিয়ে চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন পশ্চিমবঙ্গের সদ্যসাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মঙ্গলবার দেওয়া বক্তব্যে মমতা দাবি করেন, হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন কয়েকজন ব্যক্তি মেঘালয় সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করার পর তাদের গ্রেপ্তার করেছিল রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। তবে সেই তথ্য প্রকাশ না করার জন্য ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ব্যক্তিগতভাবে তাকে ফোন করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মমতার এই বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে শরিফ ওসমান বিন হাদির নামকে। ৩২ বছর বয়সী হাদি ছিলেন বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম পরিচিত মুখ এবং ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর প্রতিষ্ঠাতা মুখপাত্র।
ঝালকাঠির এক মাদ্রাসা শিক্ষকের সন্তান হাদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি দ্রুত জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিতি লাভ করেন এবং ভারত-বিরোধী অবস্থানের কারণে ব্যাপক আলোচনায় আসেন।
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলার পাশাপাশি ভারতের নীতির সমালোচনায় সরব ছিলেন তিনি। তার বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান দেশের একাংশের তরুণদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাড়া ফেলেছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন তিনি।
কিন্তু সেই রাজনৈতিক উত্থানের মাঝেই ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে হামলার শিকার হন হাদি। জুমার নামাজ শেষে রিকশায় যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা কাছ থেকে তাকে গুলি করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পরে এভারকেয়ার হাসপাতাল এবং সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। তবে চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর দেশে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে।
তদন্তের অগ্রগতিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) জানায়, হামলার মূল শুটার হিসেবে ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটানোর পর তারা ভারতে পালিয়ে যান।
পরে চলতি বছরের মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ এলাকা থেকে ওই দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে এসটিএফ। সীমান্ত পারাপারে সহায়তার অভিযোগে ফিলিপ সাংমা নামের আরেকজনকেও আটক করা হয়। সে সময় ঘটনাটি সীমান্তপারের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা অভিযান হিসেবেই আলোচিত হয়েছিল।
তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই ঘটনাকে নতুন রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে।
সমাবেশে তিনি বলেন, বাংলাদেশের একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পশ্চিমবঙ্গের এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল। এরপর ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে ফোন করে বিষয়টি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান। দেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই তিনি এতদিন বিষয়টি প্রকাশ করেননি বলেও দাবি করেন মমতা।
তার বক্তব্যের সময় উপস্থিত সমর্থকেরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম প্রকাশের আহ্বান জানালেও তিনি তা থেকে বিরত থাকেন। মমতার ভাষ্য, বিষয়টি প্রকাশ করলে বাংলাদেশে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে এবং তিনি তা চান না।
তবে তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা জড়িত ছিলেন সে সম্পর্কে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। যদিও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম তিনি প্রকাশ করেননি।
মমতার এই বক্তব্য ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তার দাবি যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি শুধু একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড নয়, বরং আঞ্চলিক রাজনীতি ও সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা প্রশ্নেও নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে।
