সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট আমানত এক বছরে ৪১% বৃদ্ধি, পৌঁছেছে প্রায় ১২ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকায়

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট আমানতের পরিমাণ ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে এ আমানত ৪১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪২ লাখ সুইস ফ্রাঁতে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকার সমান।

বৃহস্পতিবার সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) প্রকাশিত ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড’ শীর্ষক বার্ষিক পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট আমানতের পরিমাণ ছিল ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা প্রায় ৯ হাজার ১৬ কোটি টাকা। ফলে এক বছরে আমানত বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা।

এসএনবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট আমানত সর্বোচ্চ ৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছেছিল। ২০২৫ সালের আমানতের পরিমাণ সেই রেকর্ডের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশের ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংকগুলোর নামে রাখা অর্থের হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে কারা এ অর্থ জমা রেখেছেন বা কী উদ্দেশ্যে রেখেছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট আমানত ছিল ৬৬ কোটি ১৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ। পরবর্তী কয়েক বছরে ওঠানামার পর ২০২১ সালে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর ২০২২ ও ২০২৩ সালে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেলেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে আমানত বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর জমা অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি। এক বছরে তাদের আমানত ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৫৭ কোটি ৬৬ লাখ সুইস ফ্রাঁ থেকে ৮২ কোটি ২৭ লাখ সুইস ফ্রাঁতে উন্নীত হয়েছে।

ব্যাংক খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর রাখা অর্থ আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের স্বাভাবিক অংশ। তাদের মতে, বিভিন্ন দেশে ভালো মুনাফার সুযোগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনেই ব্যাংকগুলো বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে। ফলে এ ধরনের আমানত বৃদ্ধি অবৈধ অর্থপাচারের সরাসরি ইঙ্গিত বহন করে না।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট মোট আমানতের ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশই ছিল বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশ। বিপরীতে ব্যক্তিগত গ্রাহকদের আমানত প্রায় ১০ শতাংশ কমে ১ কোটি ১৪ লাখ সুইস ফ্রাঁতে নেমে এসেছে, যা আগের বছর ছিল ১ কোটি ২৬ লাখ সুইস ফ্রাঁ।

একসময় গ্রাহকের গোপনীয়তার জন্য পরিচিত সুইস ব্যাংকগুলো বর্তমানে অর্থপাচার ও কর ফাঁকি রোধে অধিক স্বচ্ছতা অনুসরণ করছে। ২০১৮ সাল থেকে চালু থাকা অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন (এএইওআই) ব্যবস্থার আওতায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে হিসাবধারীদের আর্থিক তথ্য নিয়মিত বিনিময় করা হয়।

তবে ওইসিডির গ্লোবাল ফোরামের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনো এএইওআই ব্যবস্থায় যোগদানের আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেয়নি। অন্যদিকে ভারত ও পাকিস্তান ইতোমধ্যে এ ব্যবস্থার আওতায় তথ্য বিনিময় করছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি আমানত ছিল ভারতের, যার পরিমাণ ৩২০ কোটি সুইস ফ্রাঁ। যদিও দেশটির আমানত আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। একই সময়ে শতকরা হিসাবে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে আফগানিস্তানের আমানতে, যা বেড়েছে ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ।

সামগ্রিকভাবে ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সুইস ব্যাংক আমানতে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানের আমানত কমলেও বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান এবং মালদ্বীপের আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে।