পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে এক মুসলিম কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, কিশোরীকে হত্যার আগে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে এবং জীবিত অবস্থায় বস্তাবন্দি করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।
সোমবার প্রকাশিত ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত কিশোরীর ফুসফুসে কাদা মিশ্রিত পানি পাওয়া গেছে। চিকিৎসকদের মতে, সাধারণত পানিতে ডুবে মৃত্যুর ক্ষেত্রেই এমন লক্ষণ দেখা যায়। এ কারণে তদন্তকারীদের ধারণা, পুকুরে ফেলে দেওয়ার সময় কিশোরী এখনও জীবিত ছিল।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কিশোরীর যৌনাঙ্গে একাধিক আঘাতের চিহ্ন এবং মাথায় গুরুতর জখমের আলামত রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, মাথায় ভারী কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে অথবা শক্ত কোনো স্থানে আছড়ে ফেলার ফলে এসব আঘাতের সৃষ্টি হতে পারে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং পানিতে ডুবে শ্বাসরোধ, এই দুই কারণকে সম্ভাব্য মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চিকিৎসকদের ধারণা, শনিবার গভীর রাতেই তার মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে পুরো ঘটনার পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে পুলিশ। তদন্তকারীদের মতে, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে বলে সন্দেহ আরও জোরালো হচ্ছে।
পুলিশের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শনিবার বিকেল ৪টা ৪১ মিনিটে সূর্যপুর বাজারের প্রধান সড়ক দিয়ে কিশোরীকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। তার কয়েক কদম পেছনে লাল টি-শার্ট পরা এক যুবককে দেখা যায়, যাকে স্থানীয়রা প্রভাস মণ্ডল হিসেবে শনাক্ত করেন। পরদিন রোববার সকাল ৭টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের একটি পুকুর থেকে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তদন্তে জানা গেছে, প্রভাস মণ্ডল এলাকায় মাদকাসক্ত ও বেকার যুবক হিসেবে পরিচিত। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর আরও কয়েকজনের নাম সামনে আসে। তবে পুলিশের দাবি, প্রভাসের বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে। প্রথমে তিনি ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করলেও পরে বলেন, চারজন ব্যক্তি তার কাছ থেকে কিশোরীকে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে আনন্দ সর্দার নামে একজনকে তিনি চিনতেন বলেও জানান। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, কিশোরীকে অপহরণ করে তার বাবার কাছে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করার পরিকল্পনা ছিল।
তবে তদন্তকারীদের মতে, প্রভাস এখনও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছেন। তিনি দাবি করেছেন, আনন্দই কিশোরীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছেন। কিন্তু যদি তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকেন, তাহলে হত্যার ধরন কিংবা মরদেহ কোথায় ফেলা হয়েছে, সে বিষয়ে কীভাবে জানলেন, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার অন্যদের বক্তব্যেও একই ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, ঘটনার সময় অভিযুক্তরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন।
যৌন নির্যাতনের পর কেন কিশোরীকে হত্যা করা হলো, তা নিয়ে দুটি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রথমত, ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তরা একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় কিশোরী অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে পারত। তাই প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, শনিবার রাত থেকেই কিশোরীর নিখোঁজ হওয়ার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় অভিযুক্তরা ধরা পড়ার আশঙ্কায় তাকে মাথায় আঘাত করে এবং পরে বস্তাবন্দি অবস্থায় পুকুরে ফেলে দেয়।
তদন্তকারীদের ধারণা, মাথায় গুরুতর আঘাত পেলেও পুকুরে ফেলে দেওয়ার সময় কিশোরী অজ্ঞান অবস্থায় জীবিত ছিল। পরে পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়।
নিহতের এক প্রতিবেশী দাবি করেন, যে বস্তায় মরদেহ পাওয়া যায়, সেটি তার দিয়ে বাঁধা থাকলেও ছেঁড়া ছিল। তার ভাষ্য, এতে মনে হচ্ছে, শেষ মুহূর্তে বস্তা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেছিল মেয়েটি।
ঘটনাটি ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তারা দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানিয়েছেন। এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, ঘটনার সব দিক গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
