সিলেটে ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়া একাই তিনজনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে পুলিশের কাছে দাবি করেছেন তিনি। তবে বাবুলের এই বক্তব্যে পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না স্থানীয়রা। তাদের দাবি, নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ বা কেউ জড়িত রয়েছে কিনা, তা গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে মিতালী আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা এ দাবি জানান। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, শুধু গ্রেপ্তারকৃত বাবুলের স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর না করে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের রহস্য উদঘাটনে অধিকতর তদন্ত প্রয়োজন।
নগরের রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসায় বুধবার সকালে নিজ ঘরে খুন হন সিলেটের ব্যবসায়ী ও চেম্বারের সাবেক পরিচালক আব্দুস সাত্তার। একই ঘটনায় তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনাকেও হত্যা করা হয়। তিনজনেরই গলাকাটা এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডে পুরো সিলেটে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে ডাকাতি কিংবা পূর্বশত্রুতার বিষয়টি সামনে আসে। পুলিশও প্রথমদিকে সেদিকেই নজর দেয়। তবে সিসিটিভি ফুটেজে বাবুল মিয়ার উপস্থিতি পাওয়ার পর তদন্তে নতুন মোড় আসে। পরে বুধবার বিকালে রায়নগর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তারের পর বাবুল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে তিনি ওই বাসায় প্রবেশ করেন। প্রথমে তাহমিনাকে, পরে সুরাইয়া বেগম এবং সবশেষে আব্দুস সাত্তারকে হত্যা করেন। এরপর বেলকনি দিয়ে পালিয়ে যান। যাওয়ার সময় হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি পাশের একটি খালি প্লটের ঝোপে ফেলে দেন বলে পুলিশকে জানান তিনি।
তবে ছুরি উদ্ধারের ঘটনাও নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় বাবুলকে সঙ্গে নিয়ে ওই এলাকায় তল্লাশি চালিয়েও ছুরিটি পাওয়া যায়নি। পরে বৃহস্পতিবার সকালে শ্রমিক নিয়োগ করে ফের তল্লাশি চালায় পুলিশ। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঝোপের ভেতর থেকে একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়। কিন্তু ছুরিটিতে দৃশ্যমান কোনো রক্তের দাগ পাওয়া যায়নি।
ছুরি উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ছুরিটি পাঠানো হবে। এতে থাকা কোনো রক্তের নমুনা থাকলে তা ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত রক্তের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। এর মাধ্যমে ছুরিটি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, বাবুল হত্যার পর ছুরিসহ হাত-মুখ ধুয়ে ফেলেছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।
এদিকে স্থানীয়দের সন্দেহের অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে নিহত আব্দুস সাত্তারের জমি ও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধ। মানববন্ধনে মিতালী আবাসিক এলাকার সমাজকল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক নাজু বলেন, বাবুল গ্রেপ্তার হলেও ঘটনার রহস্য পুরোপুরি কাটেনি। হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কেউ জড়িত কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এলাকার বাসিন্দা মওদুদ আহমদ বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর ঘরের ওয়ারড্রোবের বাইরে মেঝেতে দলিলপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে। আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও রয়েছে। তাই শুধু প্রেমের সম্পর্কের কারণে একসঙ্গে তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে, স্থানীয়দের অনেকেই তা বিশ্বাস করতে পারছেন না। বাবুলকে কেউ ভাড়াটে হিসেবে ব্যবহার করেছে কিনা, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
পুলিশের পক্ষ থেকেও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ডিসি (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থল থেকে তিন পাতার একটি দলিলসদৃশ কাগজ উদ্ধার করা হয়েছে। সেটি মূল দলিল নয়, সম্ভবত ফটোকপি বা অনুলিপি। এর সঙ্গে কোনো মামলা বা সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের যোগসূত্র রয়েছে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
নিহতের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, রিকাবীবাজারের একটি মার্কেটের মালিকানা নিয়ে আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে আদালতে মামলা চলছিল। ওই মামলায় তার প্রতিপক্ষ সিরাজুল ইসলাম। ২০২৫ সালের ১৮ মে মামলার শুনানির দিন আদালত প্রাঙ্গণে আব্দুস সাত্তারের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। ওই ঘটনায় আব্দুস সাত্তারসহ তৌহিদুল হককে মারধর করা হয়। পরে তৌহিদুল হক সিরাজুল ইসলামকে আসামি করে মামলা করেন।
তৌহিদুল হকের দাবি, বর্তমানে গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তাধীন ওই মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হতে পারে। কয়েক মাস আগে মামলাটি নিয়ে আব্দুস সাত্তারকে হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মো. মঞ্জুরুল আলম জানিয়েছেন, ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি। ফলে গ্রেপ্তার বাবুল মিয়া পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। মামলা হলে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হবে। তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চাইলে আইন অনুযায়ী সেই ব্যবস্থাও করা হবে।
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত ঘটনার দ্রুত বিচার হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডেরও দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
সব মিলিয়ে বাবুলের স্বীকারোক্তিতে হত্যাকাণ্ডের একটি সম্ভাব্য চিত্র সামনে এলেও ঘটনাস্থলের আলামত, ছুরি উদ্ধারের বিষয়, সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধ এবং অতীতের হুমকির অভিযোগকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ফলে তিন হত্যার নেপথ্যে আসলেই শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় ছিল, নাকি এর পেছনে আরও কোনো পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, এখন সেই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজছে পুলিশ।
