যুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসে ভয়াবহ দাবানল: পুড়ে গেছে বহু ঘরবাড়ি, হাসপাতালে ১৯ জন

যুক্তরাজ্যে বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার দিনের পর ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসে একাধিক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুকনো ঘাস ও গাছপালায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনে বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি পুড়ে যায় এবং শত শত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। শুক্রবারও দমকলকর্মীরা আগুনের অবশিষ্টাংশ ও হটস্পট নিয়ন্ত্রণে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

স্টোরব্রিজে সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি

বৃহস্পতিবার দুপুরের আগে স্টোরব্রিজ গলফ ক্লাবের কাছে রেসকোর্স লেন এলাকায় বড় ধরনের ঘাসের আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ৫০০ একরের বেশি এলাকাজুড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১০০-এর বেশি দমকলকর্মী কাজ করেন।

ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস ফায়ার সার্ভিসের প্রধান ফায়ার অফিসার সাইমন টুহিল জানান, আগুনে ১৯টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং আরও ১৮টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতিকে তিনি তার ২৮ বছরের কর্মজীবনের অন্যতম কঠিন অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

আগুনের ঘটনায় একজন দমকলকর্মী হাসপাতালে ভর্তি হলেও পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আরও পাঁচজন দমকলকর্মী ধোঁয়া শ্বাস নেওয়াসহ সামান্য আহত হন। ছয়জন সাধারণ মানুষও ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা নেন এবং একটি শিশুকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

অন্যান্য এলাকাতেও ব্যাপক আগুন

পার্শ্ববর্তী পারশোরে বেশ কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ৩০টি সম্পত্তি খালি করে দেওয়া হয়। ধোঁয়ায় একজনের চিকিৎসা করা হয়। প্রায় ২০০টি বাড়ি বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে।

স্টোক-অন-ট্রেন্টের গোল্ডেনহিল এলাকায় আগুনে চারটি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। অগ্নিসংযোগের সন্দেহে একজন পুরুষ ও একজন নারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ওই আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সময় ধোঁয়া শ্বাস নেওয়া ও অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে ছয়জন দমকলকর্মী হাসপাতালে ভর্তি হন।

এছাড়া ওয়ারউইকশায়ারের সালফোর্ড প্রিয়র্স, বার্মিংহামের ক্যাসল ভেল, উইলেনহল, কিংস নর্টন ও ড্রুইডস হিথ এলাকাতেও বড় ধরনের আগুনের খবর পাওয়া গেছে। ক্যাসল ভেলে একটি ভবনের ছাদের অংশ ধসে পড়ে এবং একজন নারী গুরুতর আহত হন।

৫৪ জন চিকিৎসা নিয়েছেন

ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন অগ্নিকাণ্ডে মোট ৫৪ জনকে প্যারামেডিকরা চিকিৎসা দিয়েছেন এবং ১৯ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

অনেক বাসিন্দাকে হঠাৎ করে বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে হয়। স্টোরব্রিজের বাসিন্দা জেন ব্যাক্সটার জানান, পুলিশ দ্রুত তাদের বাড়ি খালি করার নির্দেশ দেয়, কারণ আগুনের গতিপথ পরিবর্তনের আশঙ্কা ছিল। তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শুধু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও পোষা বিড়াল নিয়ে বাড়ি ছাড়তে হয়।

স্থানীয় কৃষকরাও আগুনের বিস্তার ঠেকাতে ট্রাক্টর ও স্প্রেয়ার ব্যবহার করে ফায়ারব্রেক তৈরির চেষ্টা করেন।

আগুনের কারণ কী?

বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যে বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়।

দীর্ঘদিনের গরম ও কম বৃষ্টিপাতের কারণে মাটি ও উদ্ভিদ অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে পড়েছিল। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

ফায়ার সার্ভিস জনগণকে আতশবাজি ব্যবহার না করা, ডিসপোজেবল বারবিকিউ না জ্বালানো এবং বাড়ি বা খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি সিগারেট নিরাপদে ফেলার এবং কাচের সামগ্রী ব্যবহারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে এক হাজারের বেশি দাবানল

ন্যাশনাল ফায়ার চিফস কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ১,০১৭টি দাবানল রেকর্ড হয়েছে, যা গত বছরের রেকর্ড সংখ্যার সমান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ আগুনই মানুষের কারণে, ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা দুর্ঘটনাবশত শুরু হয়। তবে চলতি গ্রীষ্মের তীব্র গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে আরও চরম মাত্রার দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। এ কারণে আগুন প্রতিরোধে ভূমি ব্যবস্থাপনা ও জরুরি প্রস্তুতি আরও উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির মালিকদের করণীয়

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্রিটিশ ইন্স্যুরার্স (ABI) ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির মালিকদের নিরাপদ হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব তাদের বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে।

বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত জরুরি অর্থ সহায়তা, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি মেরামত বা পুনর্নির্মাণ এবং বসবাসের অনুপযোগী বাড়ির জন্য বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা সম্পর্কে সহায়তা দিতে পারে।

যারা বীমার আওতায় নেই, তাদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা রেড ক্রসের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে দমকলকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে আগুনের অবশিষ্টাংশ ও হটস্পট নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সূত্র বিবিসি