চট্টগ্রামে বিএনপির ভূমিধস, প্রচারে এগিয়েও ভোটে পিছিয়ে জামায়াত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। মহানগর ও জেলার ১৬টি আসনের মধ্যে ১৪টিতেই ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। বাকি দুটি আসনে জয় নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-কে। নির্বাচনের দিন বিকাল পর্যন্ত কর্মীদের সক্রিয় রাখা এবং অফলাইন-অনলাইন প্রচারে সরব উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও ভোটের অঙ্কে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি দলটি।

কেন পিছিয়ে পড়ল জামায়াত

জামায়াতপন্থি পেশাজীবী নেতা ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মানজেরি খোরশেদ আলম বলেন, নির্বাচনের আগে ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলতে পারলেও পাঁচটি বড় কারণে ফলাফল বিপর্যস্ত হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকসহ এস আলম গ্রুপের দখলে থাকা কয়েকটি ব্যাংক পুনরুদ্ধারের পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতির দায় জামায়াতের ওপর বর্তায় বলে প্রচার চালানো হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর একটি অংশ সরাসরি জামায়াত প্রার্থীদের বিপক্ষে কাজ করেছে। পাশাপাশি পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নেতিবাচক প্রচারও প্রভাব ফেলেছে।

তিনি জানান, উচ্চশিক্ষিত ও পেশাজীবী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হলেও অনেকেই গণমুখী ছিলেন না। প্রার্থীদের ইমেজ পরিচ্ছন্ন হলেও পরিচিতিতে পিছিয়ে ছিলেন তারা। বড় পরিসরে নির্বাচনী অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং ভোটারদের কেন্দ্র পর্যন্ত টেনে আনার সক্ষমতায় দুর্বলতা ছিল। আওয়ামী লীগের ভোটারদের আচরণ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পারাও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। তার মতে, এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারলে ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভালো করতে পারে দলটি।

বিএনপির পক্ষে জনমত কীভাবে তৈরি হলো

বিএনপিপন্থি পেশাজীবী নেতা ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়-এর উপাচার্য অধ্যাপক নছরুল কদির বলেন, ২০১৪ সালের পর দীর্ঘ সময় প্রকাশ্যে সক্রিয় না থাকায় জামায়াতের সংগঠনের শক্তি সাধারণ মানুষের চোখে দৃশ্যমান ছিল না। বিপরীতে বিএনপি দীর্ঘ সময় ধরে রাজপথে সক্রিয় থেকেছে। দলটির নেতাদের ওপর দমন-পীড়নের স্মৃতি ভোটারদের মধ্যে সহানুভূতি তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া-র আপসহীন অবস্থান এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর প্রত্যাবর্তনের পর নতুন উপস্থাপন ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। প্রতিপক্ষকে আক্রমণ না করে সংযত প্রচার, ৩১ দফা কর্মসূচি ও জুলাই সনদের পক্ষে অবস্থান তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ-সংবেদনশীল, সংখ্যালঘু ও ডানঘরানার উদারপন্থি ভোটারদের একটি অংশ বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছে বলে তিনি মনে করেন।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ভূমিধস বিজয় হলেও অনেক আসনে ভোটের ব্যবধান কম। কোথাও কোথাও জামায়াতের উত্থানও চোখে পড়েছে। এসব ফল বিশ্লেষণ করে আগামী দিনের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

শূন্যতা পূরণে ব্যর্থতা ও জোট ব্যবস্থাপনা

সুশাসনের জন্য নাগরিকের চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেটিকে লক্ষ্য করেই জামায়াত মাঠে নামে। কিন্তু আওয়ামী লীগের ভাসা ভোট তাদের দিকে আসেনি। ভোটারদের একটি অংশ উগ্রতার আশঙ্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এই জায়গায় তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল বিএনপি।

তিনি আরও বলেন, জোট ব্যবস্থাপনায় বিএনপি বেশি দক্ষতা দেখিয়েছে। চট্টগ্রামের কয়েকটি আসনে সমন্বয়হীনতা ও প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করার মতো সিদ্ধান্ত ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।

সামনে কী

বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামে এবারের ফলাফল শুধু তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সমীকরণ নয়, বরং ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। বিএনপির সামনে প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ, আর জামায়াতের সামনে সংগঠন ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর প্রয়োজন—দুই দলকেই নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে হবে।