অভিবাসন কমলে ভয়াবহ সংকটে পড়তে পারে ব্রিটেন

যুক্তরাজ্যে অভিবাসন ইস্যু বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম বড় বিষয়। কড়া সীমান্তনীতি ও অভিবাসন কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটের রাজনীতি জমিয়ে তুলছে বিভিন্ন ডানপন্থী দল। তবে সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান ও গবেষণা বলছে, বাস্তবতা হয়তো পুরোপুরি ভিন্ন।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা—অভিবাসন নাটকীয়ভাবে কমে গেলে বা পুরোপুরি বন্ধ হলে ব্রিটেন সামনে পড়তে পারে ভয়াবহ জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক সংকটে। এর প্রভাব পড়বে দেশের শ্রমবাজার, স্বাস্থ্যখাত, অর্থনীতি এবং সামগ্রিক জনজীবনের ওপর।

জন্মের চেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে

অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস (ONS)-এর সর্বশেষ জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬ সাল থেকেই ব্রিটেনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে জন্মের চেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হবে।

অর্থাৎ, বাইরে থেকে নতুন মানুষ না এলে দেশটির জনসংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে।

গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ব্রিটেনে জন্মহার কমছে। ২০২৪ সালে দেশটিতে জন্ম হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার শিশুর, যা ইতিহাসের অন্যতম সর্বনিম্ন। বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী কয়েক দশকে এই সংখ্যা আরও কমবে।

অন্যদিকে, ২০২৪ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে জন্মের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ বেশি হতে পারে। এই ঘাটতি পূরণে বর্তমানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন।

বার্ধক্যের স্তব্ধতা: কর্মক্ষম মানুষের সংকট

অভিবাসন বন্ধ হলে ব্রিটেনের জনসংখ্যা কেবল কমবেই না, বরং তা দ্রুত বুড়ো বা বয়স্কদের দেশে পরিণত হবে। একে বলা হচ্ছে ‘এজিং পপুলেশন’ (Ageing Population) সংকট।

রেজোলিউশন ফাউন্ডেশন ও ওএনএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩৪ সালের মধ্যে ব্রিটেনে অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনের একজন হবেন প্রবীণ নাগরিক।

অন্যদিকে তরুণ ও শিশু জনগোষ্ঠীর হার কমতে থাকবে।

এতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। কারণ কম বয়সী কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে গেলে কর আদায় কমবে, অথচ পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবার খরচ বাড়তেই থাকবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিবাসীরা মূলত কর্মক্ষম বয়সে যুক্তরাজ্যে আসেন এবং শ্রমবাজার সচল রাখতে বড় ভূমিকা পালন করেন।

অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কার আশঙ্কা

অর্থনীতিবিদদের মতে, অভিবাসন কমে গেলে ব্রিটিশ অর্থনীতিও চাপে পড়বে।

গবেষণা বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে শ্রমবাজার অন্তত ৬৩ হাজার কর্মী হারাতে পারে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমবে এবং সরকার বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন পাউন্ড কর রাজস্ব হারাতে পারে।

হাসপাতাল, রেস্টুরেন্ট, নির্মাণ, পরিবহন ও কেয়ার সেক্টরের মতো খাতগুলোতে কর্মী সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এনএইচএস ও কেয়ার সেক্টর পড়বে বড় সংকটে

ব্রিটেনের এনএইচএস এবং সামাজিক সেবা খাত দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া ও ফিলিপাইনের হাজার হাজার ডাক্তার, নার্স ও কেয়ার ওয়ার্কার বর্তমানে এই খাত সচল রাখছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠোর অভিবাসন নীতি চালু হলে স্বাস্থ্যখাতে ভয়াবহ জনবল সংকট তৈরি হতে পারে। একই সময়ে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ায় চিকিৎসাসেবার চাহিদাও বাড়বে কয়েকগুণ।

স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে সংকট আরও তীব্র হতে পারে

গবেষণায় দেখা গেছে, অভিবাসন কমে গেলে ইংল্যান্ডের তুলনায় স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে জনসংখ্যা সংকট আরও দ্রুত দেখা দিতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্যের চারটি জাতির জনসংখ্যার ভারসাম্য ধরে রাখতে এখন অভিবাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

রাজনৈতিক স্লোগান বনাম বাস্তবতা

অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য যতই কঠোর হোক না কেন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এখন ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন এখন শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের ইস্যু নয়; এটি ব্রিটেনের অর্থনীতি, শ্রমবাজার ও ভবিষ্যৎ টিকে থাকার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

তাদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত তরুণ কর্মী, করদাতা ও দক্ষ জনশক্তি ছাড়া ব্রিটেন সামনে ধীর অর্থনীতি, শ্রমিক সংকট, স্বাস্থ্যখাতের চাপ এবং সামাজিক অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে।