যুক্তরাজ্যের বেনিফিট ব্যবস্থায় ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির চিত্র সামনে এসেছে। সরকারের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে বেনিফিট জালিয়াতি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ভুলের কারণে প্রায় ৯.৯ বিলিয়ন পাউন্ড করদাতাদের অর্থ অপচয় বা খোয়া গেছে।
ডিপার্টমেন্ট ফর ওয়ার্ক অ্যান্ড পেনশনস (DWP)-এর প্রকাশিত এই তথ্য দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—যেখানে বহু পরিবার জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে কীভাবে এত বিপুল অর্থ সিস্টেমের ফাঁক গলে চলে গেল?
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে প্রায় ২ কোটি ৪৩ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের সরকারি বেনিফিট পান। গত অর্থবছরে এসব খাতে সরকারের মোট ব্যয় ছিল ৩০৮.৬ বিলিয়ন পাউন্ড। কিন্তু এর মধ্যে প্রায় ৩.২ শতাংশ অর্থ অতিরিক্ত, ভুল ব্যক্তি বা জালিয়াতির মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি জালিয়াতিতে
প্রতিবেদন বলছে, মোট অপচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে সরাসরি জালিয়াতি থেকে।
প্রায় ৬.৮ বিলিয়ন পাউন্ড মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন বা ভুল তথ্য দিয়ে তুলে নিয়েছে বলে ধারণা করছে কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া আবেদনকারীদের ভুল বা অসাবধানতার কারণে অতিরিক্ত পরিশোধ হয়েছে প্রায় ২ বিলিয়ন পাউন্ড।
অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের ভুলও কম নয়। DWP, HMRC এবং স্থানীয় কাউন্সিলগুলোর প্রশাসনিক গাফিলতি ও হিসাবের ত্রুটির কারণে আরও ১.১ বিলিয়ন পাউন্ড ভুলভাবে পরিশোধ করা হয়েছে।
ইউনিভার্সাল ক্রেডিটে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম
সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ইউনিভার্সাল ক্রেডিট খাতে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই খাতে প্রায় ৬.৭২ বিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত বা ভুয়া দাবির মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। প্রতি ১০০টি দাবির মধ্যে প্রায় ২১টিতেই অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া বা তথ্য গোপনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অনেকেই নিজেদের প্রকৃত আয়, চাকরির অবস্থা কিংবা সঙ্গীর সঙ্গে বসবাসের তথ্য গোপন করেছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পেনশন ক্রেডিট ও পিআইপিতেও উদ্বেগ
শতকরা হারের হিসেবে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ধরা পড়েছে পেনশন ক্রেডিটে।
এই খাতের মোট বাজেটের প্রায় ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ৬২০ মিলিয়ন পাউন্ড ভুলভাবে দেওয়া হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, প্রতি তিনজন গ্রহীতার একজন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছেন।
অন্যদিকে, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্য দেওয়া পার্সোনাল ইন্ডিপেন্ডেন্স পেমেন্ট (PIP)-এও জালিয়াতি বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে।
গত বছর যেখানে এই খাতে জালিয়াতির পরিমাণ ছিল ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১০ মিলিয়ন পাউন্ডে। অভিযোগ রয়েছে, অনেকেই শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও তা সরকারকে জানাননি।
প্রকৃত হকদাররাও বঞ্চিত
একদিকে যখন বিপুল অর্থ জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে অনেক প্রকৃত দাবিদার তাদের প্রাপ্য অর্থ পাচ্ছেন না।
সরকারি ভুল ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে গত বছর প্রায় ১.২ বিলিয়ন পাউন্ড কম পরিশোধ করা হয়েছে যোগ্য আবেদনকারীদের।
এ নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও সামাজিক সংগঠনগুলো বলছে, ব্রিটেনের বেনিফিট ব্যবস্থা একই সঙ্গে দুর্বল এবং জটিল হয়ে পড়েছে।
কঠোর অবস্থানে সরকার
এই ঘটনা প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
DWP জানিয়েছে, নতুন ‘ফ্রড অ্যাক্ট’-এর আওতায় এখন জালিয়াতি দমনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সন্দেহভাজনদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেনও যাচাই করা হবে।
সরকারের দাবি, ইউনিভার্সাল ক্রেডিট ও পিআইপি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কঠোর নজরদারি নয়—সিস্টেমকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর না করলে ভবিষ্যতেও এমন বিপুল অঙ্কের অর্থ অপচয় বন্ধ করা কঠিন হবে।
