যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম এতদিন পর্যন্ত তাঁর নীতিগত পরিবর্তনের রূপরেখা সামগ্রিকভাবে তুলে ধরলেও এখন তাঁকে জাতীয় নেতৃত্বের বাস্তব সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক সমঝোতা এবং কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
মঙ্গলবার জীবনযাত্রার ব্যয় (Cost of Living) মোকাবিলায় নতুন সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণার কথা রয়েছে। বার্নহাম জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের অর্থায়নের ব্যবস্থা থাকবে। অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারকে হয় কর বাড়াতে হবে, নয়তো অন্য খাতে ব্যয় কমাতে হবে। ফলে খুব দ্রুতই স্পষ্ট হবে, নতুন সরকার কোন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ঋণ গ্রহণ নিয়ে ইঙ্গিতের পর বাজারে প্রতিক্রিয়া
বার্নহাম সরকারি ঋণ গ্রহণের নিয়মে কিছু “নমনীয়তা” (Flexibility) আনার ইঙ্গিত দেওয়ার পরই আর্থিক বাজারে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
সোমবার যুক্তরাজ্য সরকারের ১০ বছরের বন্ডের সুদের হার (Gilt Yield) আবারও ৫ শতাংশের ওপরে উঠে যায়, যদিও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তা কমছিল। একই সময়ে ইউরোপের অন্যান্য বড় অর্থনীতিতে এমন প্রবণতা দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিবর্তনটি খুব বড় না হলেও এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে নতুন সরকারের প্রতিটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বাজার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
চ্যান্সেলর হিসেবে জন হিলির নিয়োগে চমক
ক্যাবিনেট পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলিকে নতুন চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম। এই সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত হলেও রাজনৈতিক মহলে মনে করা হচ্ছে, অর্থনৈতিক নীতি ও আঞ্চলিক উন্নয়নে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এ সিদ্ধান্তের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, বার্নহাম ও হিলি উভয়েই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিদ্যমান রাজস্বনীতি, শিল্পায়ন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ব্রিটিশ শিল্প ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বিষয়ে একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন।
প্রতিরক্ষা ব্যয় বনাম উন্নয়ন ব্যয়: বড় প্রশ্ন
তবে জন হিলির সামনে বড় একটি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর দাবিতে তিনি সম্প্রতি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ ছেড়েছিলেন। অথচ অতীতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির জন্য পরিবহন ও জ্বালানি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় কমানো হয়েছিল।
এখন অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নের ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখতে হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আয়কর সীমা বাড়ানোর সম্ভাবনা
নীতিগতভাবে বার্নহামের ঘনিষ্ঠ মহল আয়করের করমুক্ত আয়ের সীমা (Income Tax Threshold) স্থগিত অবস্থা থেকে মুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা £১২,৫৭০ এবং উচ্চ হারে কর আরোপের সীমা £৫০,২৭১।
প্রস্তাব অনুযায়ী এগুলো যথাক্রমে £১৩,০০০ এবং £৫২,০০০ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। তবে আরও একটি প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে ২০২২ সালে করসীমা স্থগিত না হলে বর্তমানে যে পর্যায়ে পৌঁছাত, সেখানে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় আরও অনেক বেশি হবে।
বাজেটে অতিরিক্ত চাপের আশঙ্কা
করসীমা বাড়ানোর এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের কমপক্ষে ৪ বিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর নির্ভর করবে।
বর্তমান করসীমা স্থগিত নীতি প্রথম চালু করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাক, কোভিড-১৯ মহামারির সময় নেওয়া বিপুল ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যে। পরে সাবেক চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস এই নীতি ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন, যার ফলে প্রতি ছয়জন কর্মজীবীর একজন ৪০ শতাংশ করের আওতায় চলে এসেছেন।
ইউনিয়নগুলোর সমর্থন, তবে অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন
নার্স, ধাত্রী, প্যারামেডিক, শিক্ষক ও প্রকৌশলীদের প্রতিনিধিত্বকারী বড় শ্রমিক সংগঠনগুলো করসীমা বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
তবে ডাউনিং স্ট্রিটের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, এ ধরনের নতুন ব্যয় সরকারের সামগ্রিক আর্থিক পরিকল্পনার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে শেষ পর্যন্ত কর বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ অথবা অন্য খাতে ব্যয় কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
