সাইবার হামলা ও বৈশ্বিক বাজারের চাপের মধ্যে স্বেচ্ছা অবসরের কর্মসূচি, সঞ্চয়ের লক্ষ্য ১৭০ কোটি পাউন্ড
গাড়ি নির্মাতা জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার (JLR) চাকরি কমানোর পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়াতে বেতনভুক্ত ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মীদের জন্য স্বেচ্ছা অবসরের কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে।
কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী দুই বছরে প্রায় ১.৭ বিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয়ের লক্ষ্য রয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানের কাঠামো আরও সহজ করা, কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে কর্মীসংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শনিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস জানায়, শুল্ক বৃদ্ধি ও গাড়ি বিক্রিতে পতনের প্রভাবে JLR-এ ৪ হাজার পর্যন্ত চাকরি কমতে পারে। তবে বিবিসিকে কোম্পানিটি জানিয়েছে, ৪ হাজার চাকরি কমানোর সংখ্যা তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
JLR-এর এক মুখপাত্র বলেন, কর্মীদের পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়ন অংশীদারদেরও বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং স্বেচ্ছা অবসরের মাধ্যমে কর্মীদের প্রতিষ্ঠান ছাড়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে আরও তথ্য আগে কর্মীদের জানানো হবে বলেও জানিয়েছে কোম্পানিটি।
‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক সময়’
শ্রমিক সংগঠন ইউনাইটের সাধারণ সম্পাদক শ্যারন গ্রাহাম বলেন, ব্রিটিশ গাড়ি শিল্পের ওপর দীর্ঘদিন ধরেই একটি ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ তৈরি হচ্ছে বলে তারা সতর্ক করে আসছিলেন।
তিনি বলেন, ধারাবাহিকভাবে ছোট ছোট কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে চলেছে। চাকরি হারানোর সংখ্যা কমিয়ে আনার বিষয়ে সপ্তাহান্তে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ‘তীব্র আলোচনা’ হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শ্যারন গ্রাহাম ও ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী জোনাথন রেনল্ডস আগামী সপ্তাহে JLR-এর প্রধান নির্বাহী পিবি বালাজির সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে।
ইউনাইটের জাতীয় কর্মকর্তা ডেস কুইন বলেন, JLR কর্মীদের জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও চাপপূর্ণ সময়। কর্মীদের জন্য সর্বোত্তম ফল নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন ‘দিনরাত’ কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
সাইবার হামলার ধাক্কা
JLR-এর বর্তমান সংকটের পেছনে গত বছরের বড় ধরনের সাইবার হামলারও প্রভাব রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওই সাইবার হামলার পর কয়েক সপ্তাহ কোম্পানিটির সব উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ফলে ওই সময়ে উৎপাদন লাইন থেকে একটি গাড়িও বের হয়নি।
এর প্রভাবে কোম্পানিটির সামগ্রিক উৎপাদন প্রায় ২৭ শতাংশ কমে যায়। সাইবার হামলা ও পরবর্তী উৎপাদন বন্ধের কারণে JLR-এর মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১.৯ বিলিয়ন পাউন্ড বলে ধারণা করা হয়।
চলতি বছরের জুনে কোম্পানিটি জানিয়েছিল, হামলার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে এবং পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তা করতে আগামী কয়েক বছরে প্রায় ১.৭ বিলিয়ন পাউন্ড খরচ কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। উপকরণ, ওয়ারেন্টি এবং নির্দিষ্ট পরিচালন ব্যয় কমানোর মাধ্যমে এই সাশ্রয়ের বড় অংশ অর্জনের পরিকল্পনা ছিল।
এর আগে জুলাইয়ে JLR জানিয়েছিল, তৎকালীন ব্যয় কমানোর পরিকল্পনার আওতায় ৩০০ জনেরও কম কর্মী প্রতিষ্ঠানটি ছাড়তে পারেন।
সরকারের সহায়তার আশ্বাস
যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, দেশটির গাড়ি শিল্পকে সহায়তা করতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গাড়ি নির্মাতাদের বিদ্যুৎ বিল কমানোর উদ্যোগ এবং শূন্য-নির্গমন যানবাহন উৎপাদন ও বিক্রিতে আর্থিক সহায়তা রয়েছে।
ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী জোনাথন রেনল্ডস ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের মেয়র রিচার্ড পার্কারের সঙ্গেও JLR এবং এর কর্মীদের সহায়তার বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে।
JLR-এর যুক্তরাজ্যে প্রায় ৩০ হাজার কর্মী রয়েছে। কোম্পানিটির বৈশ্বিক সদর দপ্তর কভেন্ট্রির হুইটলিতে। যুক্তরাজ্যের সলিহাল, উলভারহ্যাম্পটন ও মার্সিসাইডের হ্যালউডে তাদের উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া বিদেশের বিভিন্ন কারখানায় প্রায় ১০ হাজার কর্মী কাজ করেন।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, গত তিন বছরে তাদের ব্র্যান্ডগুলোকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের গাড়ি উৎপাদনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। তবে বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তন, শুল্কের চাপ, বিক্রি কমে যাওয়া এবং গত বছরের সাইবার হামলার প্রভাব মোকাবিলা করতে এখন বড় ধরনের ব্যয়সংকোচনের পথে হাঁটছে JLR।
সূত্র বিবিসি
