যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে গুরুত্বপূর্ণ জনসেবা ও অবকাঠামোর ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। মঙ্গলবার হাউস অব কমন্সে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলবেন, প্রয়োজনীয় সেবাগুলোকে আরও বেশি জননিয়ন্ত্রণে এনে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ছয় সপ্তাহ পর পার্লামেন্টে প্রথমবারের মতো এমপিদের সামনে নিজের সরকারের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার তুলে ধরবেন বার্নহ্যাম। তাঁর বক্তব্যের অন্যতম প্রধান বিষয় হবে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সেবাগুলোকে আরও সাশ্রয়ী করা।
বার্নহ্যামের সরকার মনে করছে, পানি, জ্বালানি ও পরিবহনের মতো মৌলিক পরিষেবার উচ্চ ব্যয় পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং একই সঙ্গে অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই এসব খাতে দীর্ঘমেয়াদে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ১০ বছরের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পানি ও জ্বালানি খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনার সম্ভাবনা রয়েছে। সংকটে থাকা থেমস ওয়াটারের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সরকারকে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথ সহজ করতে নতুন আইন করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
পরিবহন খাতেও ইতোমধ্যে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর উদ্যোগ শুরু হয়েছে। লিভারপুল সিটি রিজিয়নে বাস পরিষেবার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে, পাশাপাশি ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসেও সরকারি নিয়ন্ত্রণের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
‘আশা ফিরিয়ে আনার’ প্রতিশ্রুতি
বার্নহ্যাম তাঁর বক্তব্যে রাজনীতিতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দেবেন। তাঁর সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হবে জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে পরিবারগুলোকে কিছুটা আর্থিক স্বস্তি দেওয়া।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বার্নহ্যাম দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী এবং বর্তমান পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য তাঁর একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর লক্ষ্য, মানুষের মধ্যে আবারও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ তৈরি করা।
বার্নহ্যাম দায়িত্ব নেওয়ার সময়ও বলেছিলেন, ব্রিটেনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। তাঁর মতে, অতীতে রাজনৈতিক ক্ষমতা অতিরিক্তভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, অর্থনীতির বড় অংশ বেসরকারিকরণ করা হয়েছে এবং বহু শিল্পাঞ্চল এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি প্রয়োজনীয় সেবাগুলোকে শক্তিশালী জননিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার কথা বলেন।
নির্বাচনী সংস্কারেও বাড়ছে চাপ
অর্থনৈতিক পরিকল্পনার পাশাপাশি নির্বাচনী সংস্কার নিয়েও প্রধানমন্ত্রীকে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। প্রায় ১০০ জন এমপি ভোটিং ব্যবস্থা সংস্কারের বিষয়ে একটি জাতীয় কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।
বার্নহ্যাম অতীতে যুক্তরাজ্যের বর্তমান first-past-the-post নির্বাচনী ব্যবস্থা পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার এ বিষয়ে নতুন উদ্যোগ নেবে কি না, তা নিয়ে লেবার পার্টির ভেতরেও আলোচনা বাড়ছে। (The Guardian)
লিবারেল ডেমোক্র্যাটসহ বিরোধী দলগুলোও নির্বাচনী সংস্কারের বিষয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, লেবার এমপিদের একটি অংশ দলীয় অনুদানের সীমা নিয়েও সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন।
সামনে একাধিক বড় চ্যালেঞ্জ
পার্লামেন্টে ফিরেই বার্নহ্যাম সরকারকে একাধিক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর সাগরে নতুন তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের অনুমোদন, অভিবাসন আইন সংশোধন, প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ঘাটতি এবং শরৎকালীন বাজেট।
সরকারকে প্রায় ৪.৭ বিলিয়ন পাউন্ডের প্রতিরক্ষা অর্থায়ন ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে, সে প্রশ্নেরও মুখোমুখি হতে হবে। একই সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়ের চাপও রয়েছে। (The Guardian Mirror)
অক্টোবরের বাজেটের আগে সরকারের জন্য অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বার্নহ্যাম একদিকে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চান, অন্যদিকে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। (Financial Times)
বার্নহ্যামের পরিকল্পনার মূল বার্তা হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যেন শুধু বড় প্রতিষ্ঠান বা নির্দিষ্ট অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রয়োজনীয় সেবার খরচ কমানো, স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশজুড়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোই তাঁর সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। ফলে জননিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি কতটা দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয় এবং এর আর্থিক বোঝা কীভাবে সামলানো হয়, সেটিই এখন বার্নহ্যাম সরকারের জন্য অন্যতম বড় পরীক্ষা।
