আজ সোমবার পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস–২০২৬। এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘খাদ্য নিশ্চিত করি সুস্থ সবল জীবন গড়ি।’ দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করাই এই দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য।
বিএফএসএ জানায়, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রয় কার্যক্রমে জনসচেতনতা বাড়ানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য। তবে বাস্তবে দেশের মানুষ কতটা নিরাপদ খাদ্য পাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে বিএফএসএ চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) জাকারিয়া ট্রান্সফ্যাটের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এতে যুক্ত। একদিনে এর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মনিটরিং ও জনসচেতনতার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সবাইকে সচেতন হতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ট্রান্সফ্যাটজনিত হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ ১৫টি দেশের একটি বাংলাদেশ। দেশে হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ৪ দশমিক ৪১ শতাংশের জন্য দায়ী ট্রান্সফ্যাট।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আফজালুর রহমান বলেন, ট্রান্সফ্যাট রক্তের ভালো কোলেস্টেরল কমিয়ে দেয় এবং খারাপ কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দেয়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। চিকিৎসক ও গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগে মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই হৃদরোগজনিত, যার সংখ্যা বছরে প্রায় তিন লাখ।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিমেল সাহা জানান, দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণগুলোর একটি ট্রান্সফ্যাট। গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটের বড় উৎস হলো পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল (পিএইচও), যা ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামে পরিচিত। বেকারি পণ্য, ভাজাপোড়া খাবার এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সড়কসংলগ্ন দোকানের খাবারে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
পুষ্টিবিদদের মতে, ট্রান্স ফ্যাটি এসিড একটি ক্ষতিকর উপাদান, যা হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণে বিএফএসএ সব ধরনের তেল ও খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশ নির্ধারণ করে প্রবিধানমালা জারি করেছে।
এদিকে ফাস্ট ফুডে অতিরিক্ত টেস্টিং সল্ট ব্যবহারের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত টেস্টিং সল্ট গ্রহণ কিডনি বিকলসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির সমীক্ষায় আলুর চিপস, নুডুলস, পপকর্ন ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ে অতিমাত্রায় টেস্টিং সল্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও ট্রান্সফ্যাট হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ক্যানসারের মতো রোগের অন্যতম কারণ। তারা জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনগত কাঠামো আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, খাবারের নামে মানুষ বিষ কিনে খাচ্ছে কি না, তা ভাবার সময় এসেছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত না হলে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ আরও বাড়বে।
এদিকে সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ মোড়কজাত খাদ্যে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সতর্কবার্তা নেই। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মোড়কজাত খাদ্যে চিনি, লবণ ও ট্রান্সফ্যাটের তথ্য উল্লেখ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ চলছে।
নিরাপদ খাদ্য দিবসে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শুধু দিবস পালন নয়, বরং কঠোর প্রয়োগ, জবাবদিহি এবং সচেতন ভোক্তা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
