বাংলাদেশে গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়নের বড় অংশই হয়েছে বৈদেশিক ঋণে পরিচালিত মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে। কিন্তু এসব প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন শুরু হয়েছে মূল ঋণ পরিশোধের চাপ, যা আগামী কয়েক বছরে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী-এর সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে এই ঋণ ব্যবস্থাপনা।
ব্যয়-স্ফীতি ও ঋণনির্ভর উন্নয়ন
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ব্যয় অনুমানের তুলনায় ৩০–৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। যেমন পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প-এর প্রাথমিক ব্যয় ছিল প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকায়। অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় অংশ এসেছে বৈদেশিক ঋণ থেকে।
একইভাবে ঢাকা মেট্রোরেল লাইন–৬-এর ব্যয় ২১ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩৩ হাজার কোটির বেশি হয়েছে।
গ্রেস পিরিয়ড শেষ, শুরু কিস্তির চাপ
পদ্মা রেল প্রকল্পের চীনা ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে এবং ২০৪৪ পর্যন্ত ঋণ পরিশোধ চলবে। মেট্রোরেলের জাপানি ওডিএ ঋণের কিস্তি ২০৬১–৬২ অর্থবছর পর্যন্ত ধাপে ধাপে পরিশোধ করতে হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এর ক্ষেত্রেও ২০২৮ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধ শুরু হবে, যা ২০৪৮–৪৯ পর্যন্ত চলবে।
এরই মধ্যে দোহাজারী–কক্সবাজার রেললাইন ও কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হয়ে গেছে এবং প্রকল্পগুলো অপারেশনাল লোকসানে থাকায় বাজেট থেকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
আয় কম, ভর্তুকি বেশি
সরকারের ধারণা ছিল মেগা প্রকল্পগুলো চালুর পর নিজস্ব আয় থেকেই ঋণ শোধ হবে। বাস্তবে তা হয়নি।
- পদ্মা রেলে প্রত্যাশিত যাত্রীসংখ্যা হয়নি
- মেট্রোরেলে দৈনিক ২–২.৫ লাখ যাত্রী থাকলেও পরিচালন ব্যয় বেশি
- রূপপুর বিদ্যুতের ইউনিটমূল্য বাজারদামের নিচে
ফলে প্রায় সব প্রকল্পেই ঋণপরিশোধের জন্য বাজেট ভর্তুকি বাড়ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাজেট সংকোচন ও কর বৃদ্ধির আশঙ্কা
অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী ৩–৫ বছরে ঋণ কিস্তির পরিমাণ দ্রুত বাড়বে। এতে সম্ভাব্য প্রভাবগুলো হতে পারে—
- বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার কমানো
- ছোট প্রকল্প স্থগিত
- মেট্রোরেল ও রেলের ভাড়া বৃদ্ধি
- বিদ্যুতের দাম সমন্বয়
- নতুন কর বা ভ্যাট বৃদ্ধি
বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম হওয়ায় রাজস্ব না বাড়লে ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়বে।
অর্থমন্ত্রীর সামনে করণীয়
অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণচাপ পুরোপুরি কার্যকর হবে। তার মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি—
- ঋণ পুনর্বিন্যাস ও পুনঃতফসিল
- প্রকল্প পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধি
- ভর্তুকি হ্রাস
- রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এখনই কার্যকর পরিকল্পনা না নিলে মেগা প্রকল্পের ঋণচাপ আগামী কয়েক বছর দেশের অর্থনীতির জন্য “টিকটিক করা টাইম বোমা” হয়ে উঠতে পারে।
