যুক্তরাজ্যে ফ্ল্যাট মালিকানায় আসছে বড় সংস্কার: লিজহোল্ড বাতিল করে কমনহোল্ড আনছে ব্রিটিশ সরকার

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত লিজহোল্ড (Leasehold) ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন কমনহোল্ড (Commonhold) ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। প্রস্তাবিত Commonhold and Leasehold Reform Bill অনুযায়ী, ভবিষ্যতে নতুন নির্মিত কোনো ফ্ল্যাট আর লিজহোল্ড হিসেবে বিক্রি করা হবে না। এর পরিবর্তে ফ্ল্যাটের বাসিন্দারাই সম্মিলিতভাবে ভবনের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবেন।

সরকারের এই উদ্যোগকে যুক্তরাজ্যের আবাসন খাতে গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় সংস্কার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকারের দাবি, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে ফ্ল্যাট মালিকরা নিজেদের সম্পত্তির ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করবেন।

এই সংস্কারের পেছনে অন্যতম কারণ লিজহোল্ড ব্যবস্থায় বসবাসকারী লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের অভিযোগ। বিবিসির এক জরিপে এক হাজারের বেশি লিজহোল্ড মালিক জানিয়েছেন, দ্রুত বেড়ে যাওয়া সার্ভিস চার্জ ও গ্রাউন্ড রেন্টের কারণে তারা নিজেদের বাড়ির ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন।

লন্ডনের ৭৪ বছর বয়সী বাসিন্দা স্যালি, যিনি ২০২১ সালে একটি দুই শয়নকক্ষের ফ্ল্যাট কিনেছিলেন, জানান অবসরের শান্ত জীবন কাটানোর আশা নিয়ে বাড়িটি কিনলেও তাকে বাড়তি আর্থিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তার ভাষ্য, প্রথমদিকে বছরে প্রায় ২ হাজার ৬০০ পাউন্ড সার্ভিস চার্জ দিলেও এক পর্যায়ে তা বেড়ে ৫ হাজার ৪০০ পাউন্ডেরও বেশি হয়। এতে তিনি এবং একই ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারা চরম উদ্বেগ ও মানসিক চাপে পড়েন।

আবাসনমন্ত্রী ম্যাথিউ পেনিকুক বলেছেন, ভবনের প্রকৃত মালিক ও রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সেখানে বসবাসকারী মানুষেরই হওয়া উচিত, কোনো তৃতীয় পক্ষের ফ্রি-হোল্ডারের নয়।

বর্তমান লিজহোল্ড ব্যবস্থায় ফ্ল্যাট মালিকরা ভবনের জমির মালিক হন না। নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বসবাসের অধিকার পান এবং গ্রাউন্ড রেন্ট ও সার্ভিস চার্জ পরিশোধে বাধ্য থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যয় সময়ের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, ফলে সম্পত্তি বিক্রি, মর্টগেজ বা পুনঃমর্টগেজ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

নতুন কমনহোল্ড ব্যবস্থায় ভবনের বাসিন্দারাই যৌথভাবে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবেন। ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও অন্যান্য ব্যয়ের বিষয়ে তারা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন এবং প্রয়োজনে কোনো ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করতে পারবেন।

তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কমনহোল্ড ব্যবস্থাও পুরোপুরি সমস্যামুক্ত নয়। কোনো বাসিন্দা রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ পরিশোধে অস্বীকৃতি জানালে বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মতৈক্য না হলে ভবন পরিচালনায় অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হতে পারে।

তবে আবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাজ্যের বর্তমান লিজহোল্ড ব্যবস্থা বিশ্বে ব্যতিক্রম। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশেই কমনহোল্ড বা অনুরূপ যৌথ মালিকানার ব্যবস্থা সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

যদিও সরকার নতুন ভবনগুলোতে কমনহোল্ড বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নিয়েছে, তবে বিদ্যমান লিজহোল্ড ভবনগুলোকে কীভাবে নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে মর্টগেজ ঋণদাতা, ডেভেলপার, মূল্যায়নকারী এবং সম্পত্তি খাতের অন্যান্য অংশীজনদেরও নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে, ব্রিটিশ সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ফ্ল্যাট মালিকানার কাঠামোতে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।