ভারতে সাপের কামড়ে প্রতি বছর প্রাণ যাচ্ছে হাজারো মানুষের

ভারতে সাপের কামড়ে প্রতি বছর মারা যাচ্ছেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ, যা বিশ্বে মোট সাপের কামড়ে মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক। সরকারি হিসাবের বাইরে বিভিন্ন গবেষণায় এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গ্লোবাল স্নেকবাইট টাস্কফোর্স (জিএসটি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের স্বাস্থ্যকর্মীদের ৯৯ শতাংশই সাপের কামড়ের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ অ্যান্টিভেনম প্রয়োগে নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়েন। দুর্বল অবকাঠামো, পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনমের অভাব এবং প্রশিক্ষণের ঘাটতিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে ভারতসহ ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়ার ৯০৪ জন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, চিকিৎসা দিতে দেরি হওয়ার কারণে অনেক রোগীর অঙ্গচ্ছেদ, জটিল অস্ত্রোপচার কিংবা স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতা দেখা দিয়েছে।

ভারতের একজন কৃষক দেবেন্দ্র সাপের কামড়ে নিজের পা হারানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, কামড়ের চার দিন পর হাসপাতালে যাওয়ায় তার জীবন বাঁচলেও পা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি ভাগ্যবানদের একজন, কারণ অনেকেই চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারান।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০১৭ সালে সাপের বিষক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ‘অবহেলিত উষ্ণমণ্ডলীয় রোগ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন এবং এক লাখের বেশি মানুষ মারা যান। এর শিকার মূলত দরিদ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠী।

ভারতের কেন্দ্রীয় ও পূর্বাঞ্চলে সাপের কামড়ে মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা বেশি বলে জানান জিএসটির সদস্য ও চিকিৎসক ডা. যোগেশ জৈন। তিনি বলেন, কৃষিকাজে যুক্ত দরিদ্র ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে।

২০২৪ সালে ভারত সরকার ‘ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান ফর প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল অব স্নেকবাইট এনভেনোমিং (ন্যাপসে)’ চালু করে, যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সাপের কামড়ে মৃত্যু অর্ধেকে নামিয়ে আনা। পরিকল্পনায় নজরদারি জোরদার, অ্যান্টিভেনম সরবরাহ বৃদ্ধি, চিকিৎসা সক্ষমতা উন্নয়ন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবায়নে এখনও ঘাটতি রয়েছে।

ডা. জৈনের মতে, গ্রামীণ এলাকায় খারাপ যোগাযোগব্যবস্থা, দূরের হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্সের অভাব চিকিৎসা বিলম্বের বড় কারণ। পাশাপাশি অপ্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগে ভয় এবং গ্রামাঞ্চলে ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এ ছাড়া ভারতে বর্তমানে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম মূলত ‘বিগ ফোর’ প্রজাতির সাপের বিরুদ্ধে কার্যকর। অন্যান্য বিষধর প্রজাতির জন্য অঞ্চলভিত্তিক অ্যান্টিভেনমের অভাব রয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাপের কামড়কে বাধ্যতামূলকভাবে রিপোর্টযোগ্য রোগ হিসেবে ঘোষণা, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং অঞ্চলভিত্তিক অ্যান্টিভেনম উৎপাদন ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে।

ডা. জৈনের ভাষায়, “সাপের কামড়ে মৃত্যু শুরু হয় যেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা শেষ হয়। দরিদ্র মানুষের জন্য দরিদ্র স্বাস্থ্যব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়।”